গৃহবন্দীর জবানবন্দী- ৩৪

প্রকাশিত: ৯:২২ অপরাহ্ণ, মে ৭, ২০২০ | আপডেট: ৯:২৭:অপরাহ্ণ, মে ৭, ২০২০
গৃহবন্দীর জবানবন্দী- ৩৪

যেহেতু করোনা সম্পর্কে চিকিৎসা বিজ্ঞান একমত হয়ে সুনির্দিষ্ট কোন ব্যাখ্যা কিংবা চিকিৎসা দিতে পারেননি। মানুষ গবেষকদের ঔষধের কিংবা ভেকসিনের অপেক্ষায় কতকাল থাকবে। সর্দি, জ্বর কাশী, গলা ব্যাথা, শ্বাস কষ্ট, ড়ায়েরিয়া, নিমোনিয়া বাংগালীর গতানুগতিক রোগ।

করোনার ক্ষেত্রে একই উপস্বর্গ। এর বাহিরে করোনা রোগের নতুন কোন উপস্বর্গের কথা এখন পর্যন্ত চিকিৎসা বিজ্ঞান তুলে ধরেনি। তাদের মধ্যে রয়েছে সিদ্ধান্ত হীনতা, রয়েছে সমন্বয় হীনতা, রয়েছে প্রতিষেধক আবিস্কারের অনিশ্চিত ঘোষণা।

ফলে এসব উপস্বর্গ দেখা দিলে হাসপাতালের স্মরনাপন্ন না হয়ে মানুষ গতানুগতিক রোগ মনে করে এজিসথ্রোমাইসিন, মনটেক্স, ফেক্সোমিন, প্যারাসিটামল সেবন করে সুস্হতা নিয়ে ভাল আছেন। যেহেতু বড় বড় গবেষক করোনার গবেষণায় মত্ত, সাধারন মানুষ কোথায় যাবে ।হাসপাতাল তার নিরাপত্তা নেই। যে কারনে মানুষ নিজের স্বভাবে নিজেই টোটকা চিকিৎসা করেছে কিংবা কোয়াক ডাক্তারের সাথে গোপন আলাপে ঔষধ সেবন করে সুস্হ হয়েছে। যে কারনে ফার্মিসিতে এবার উল্লেখিত ঔষধের রমারমা ব্যবসা।

অধিকন্তু, গরম পানিতে গড়গড়া, গরম পানিতে পরিস্কার কাপড় ভিজিয়ে চিপে নাক দিয়ে ভাপ নিয়ে মুখ দিয়ে শ্বাস ছেড়ে ফুসফুসের প্রদাহ নিবারন করেছে। গরম পানিতে লেবুর রস দিয়ে পান করায় মানুষ অনেক স্বস্তি পেয়েছে। কেউবা গোল মরিচ দশ পিস, লেবু দুই পিস, লং দশ পিস, দারচিনি পরিমান মত, আদা একশত গ্রামের সাথে এক লিটার পানি মিশিয়ে চুলায় জ্বাল দিলে কিছুক্ষন পর যে বাস্প বের হয়, তা মুখে রুমাল দিয়ে নি:শ্বাস নিয়ে ভেন্টিলেসনের চাহিদা পূরন করেছে। অতপর এক ঘন্টা পর পর তা চায়ের মত পান করে করোনার মোকাবিলা করেছে ।

সেদিন আমার কলেজের অবসর প্রাপ্ত শরীর চর্চা শিক্ষক জালাল উদ্দিন বললেন তিনদিন পূর্বে তার প্রচন্ড জ্বর, গলা ব্যথা, সর্দি, কাশি, ডায়রিয়া অর্থাৎ করোনার সকল উপস্বর্গ। টেষ্ট করানো হলে কি হতো জানিনা। তবে ঢাকা অবস্হান করলে করোনার পজেটিভ রিপোর্ট নিয়ে তাকে তাল তলা গোরস্হানে যেতে হতো এটা নিশ্চিত। ভদ্রলোক নিজে ঔষধ ব্যবসায়ী। সচেতন মানুষ। চুপে চুপে নিজের চিকিৎসা নিজে করেছেন। দু দিনের মাথায় সুস্হ হয়েছেন।

গবেষকরাই মন্তব্য করেছেন, শতকরা আশিজন বিনা চিকিৎসায় ভাল হয়ে যায় । তারাই বলেছেন, অনেকের মধ্যে করোনার জীবানু থাকলেও তার প্রকাশ ছাড়া সে ভাল হয়ে যায় । আবার আক্রান্তের তুলনায় মুত্যুর হার কম । করোনার যেসব উপস্বর্গ এই উপস্বর্গ নিয়ে যুগযুগ ধরে অনেক মানুষ মৃত্যু বরণ করেছে । উপস্বর্গ যেহেতু একই ; তবে কি করোনা পৃথিবীতে অনেক আগেই ছিল । বিভিন্ন দেশ ব্যবসায়ীক স্বার্থে নানান কৌশল জুড়ে দিয়ে লকডাউন শিথিল করেছে । স্বাস্হ্য বিধি মেনে চলার শর্তে মিল কল কারখানা শপিং মল খুলে দেয়া হয়েছে ।

মসজিদে মুসল্লীদের নামায পড়ার শর্ত শিথিল করা হয়েছে । যে কারনে মানুষের কাছে করোনার গুরুত্ব কমে গেছে । করোনার কবর হোক ।কিন্তু মসজিদের মুসল্লী যেন না কমে ।

মাঠ এখন হোম কোয়ারেন্টাইনের বাহিরে যারা আছেন, তাদের দখলে । আমরা যারা লকডাউনে লং টাইম হোম কোয়ারেন্টাইন বাসিন্দা, আমাদের কি উপায় ? আমরা না ঘরকা, না ঘাটকা । আমাদেরকে গৃহবন্দী করে সারা দেশে লক ডাউন শিথিলের যেন শৈত প্রবাহ বইছে । মনে হয় দু দিন পর ঘর থেকে বের হলে আমরা হাস্যস্পদ হব ।

আজ বাদ আসর আবদুল্লাহ পুর ইউনিয়নের খাসের হাট এলাকায় আমার বোনের শাশুরীর নামাযে জানাযায় শরীক হয়েছি । বার্ধক্য জনিত কারনে মৃত্যু। প্রতিদিন মৃত্যুর সংবাদ । সৌভাগ্য আমাদের এলাকায় অন্তত করোনার উপস্বর্গ নিয়ে মৃত্যু কারো হয়নি । জানাযায় প্রচুর লোক হয়েছে । অনেকদিন পর ঐ এলাকায় গিয়েছি। পরিচিত সবাই হাত মিলাল, জড়িয়ে ধরল ।সামাজিকতার বন্ধনের কাছে সামাজিক দুরুত্ব বজায় রাখার নিয়ম হার মানল । কারো মুখে মাস্ক ছিলনা । যে কারনে সমাজ রক্ষা করতে যেয়ে আমার মাস্ক পকেটে ঢুকিয়ে রেখেছি ।

মনে পড়ল, স্নাতক শ্রেনীর ক্লাশে মোতাহের হোসেন চৌধুরীর “সংস্কৃতি কথা” প্রবন্ধে ‘তুমি দশের মধ্যে এক না হয়ে এগার হও’। এবড় কঠিন কাজ । ছাত্রদের বুজাতে যেয়ে বলেছিলাম, লুঙ্গী পরা সমাজে কেউ উলংগ থাকলে, তাকে সবাই পাগল বলে । তেমনি উলংগ সমাজে কেউ লুঙ্গী পড়লে তাকে সবাই পাগল বলে । জনতার মাঝে আমি পাগল সাজতে চাইনি । যতই শিক্ষিত হই ।আমিতো এই সমাজের মধ্যেই লালিত পালিত ।

কথা আর বাড়াবনা । করোনার আয়ুস্কাল থাকার কথা চৌদ্দ দিন ।মানুষ দুই মাস করোনার তামশা দেখেছে । মানুষের অজ্ঞতা হোক, আর কর্তৃপক্ষের কৌশলগত অবস্হান হোক । করোনার বর্তমান গতিবিধির জন্য মানুষই দায়ী । তবে মানুষ এখন আর গৃহবন্দী থাকতে চায়না । বাইন্দা কিলাইলে কিল কে না খায় । তবে মানুষ এখন গৃহবন্দীর যন্ত্রনা থেকে মুক্তি চায় । দেশের সাতটি প্রাতিষ্ঠানিক কোয়ানেন্টাইন সেন্টার সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধায়নে পরিচালিত হওয়ার নতুন ঘোষনাকে সবাই সাধুবাদ জানিয়েছে ।

দীর্ঘ দিন গৃহবন্দী থেকে কত কিছু নিরবে নিভৃতে হজম করতে হচ্ছে । কত রোগের উপস্বর্গ ধামা চাপা দিয়ে রাখা হচ্ছে । করোনার ভয়ে সব রোগ শরীরের মধ্যে জমাট বেঁধে আছে । কর্মহীন জীবনে নিজেকে মনে হচ্ছে অথর্ব । হোম কোয়ারেন্টাইন জীবন যেন অবসর জীবনের অগ্রিম মহড়া ।

মাথার চুলের দিকে তাকালে নিজেকে অবসর প্রাপ্ত কর্মকর্তা মনে হয় । চুলে যেন অকাল বার্ধক্যের ছাপ । অধিকন্তু চুল যেভাবে বেড়েছে, তাতে আশির দশকের ছাত্র জীবনের কথা মনে করিয়ে দিচ্ছে । যে কায়দায় প্রতিদিন ক্লিন সেভ হচ্ছি, সে কায়দায় তো আর মাথার চুল কাটতে পারছিনা । করোনা মুহূর্তে সেলুন নাকি বেশী ঝুঁকি পূর্ণ। কি আর করার আছে । নিত্যকার নরসুন্দর হৃদয় শীলকে বাসায় আমন্ত্রন জানানো ছাড়া কোন পথ নেই । দেখি হৃদয়ের হাতের ছোঁয়ায় নব যৌবনের কিছুটা অভিনয় করা যায় কিনা । (চলবে)

লেখকঃ কায়ছার আহমেদ দুলাল।

অধ্যক্ষ, চরফ্যাসন সরকারি কলেজ।