হাটহাজারীতে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের সৃজনশীলতা

প্রকাশিত: ১০:১৯ অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৯, ২০২০ | আপডেট: ১০:২০:অপরাহ্ণ, জানুয়ারি ২৯, ২০২০
হাটহাজারীতে সুবিধা বঞ্চিত শিশুদের সৃজনশীলতা

পূজা দে স্কুলে যায়নি, তার মা’র অসুখ। তাই তার দুই বন্ধু অর্নিবান এবং মাহমুদ এসেছে তাকে স্কুলে নিয়ে যেতে। স্কুলের আপা পাঠিয়েছে তাদেরকে। কেন পূজা স্কুলে যায়নি তা দেখতে এবং তাকে নিয়ে যেতে। পূজা প্রি-স্কুলের ছাত্রী। তার ক্লাসে ২০ জন ছাত্র-ছাত্রী। একমাত্র পূজা ছাড়া বাকী সবাই স্কুলে এসেছে। তাই অন্যরা সবাই তার জন্য চিন্তিত হয়ে পড়েছিল।

সূবর্ণা (৫) হাটহাজারী পৌরসভার ২নং ওয়ার্ডের পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত সনাতন পল্লী গ্রামের হত দরিদ্র পরিবারের কৃষক নিতাই দে’র মেয়ে। বিভিন্ন সময়ে ঘটে যাওয়া প্রাকৃতিক ঝড় ও জলোচ্ছাসে তার ঘর-বাড়ি তছনছ করে দিয়েছে। এখনও তার পরিবার সেই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে পারেনি। সে একটি বিদেশী সাহায্যপুষ্ট ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ কর্তৃক পরিচালিত শিখন শিকড় স্কুলে পড়ে।

স্থানীয় কমিউনিটি ও গ্রাম উন্নয়ন কমিটির যৌথ অংশীদারিত্বে এই গ্রামে ২০১৬ সালে প্রতিষ্ঠিত হয় শাপলা শিখন শিকড় কেন্দ্রটি। প্রতিদিন সকাল ৯টা থেকে ১২ টা পর্যন্ত ২০ জন শিশুর উপস্থিতিতে স্কুলটি চলে। বর্তমানে পান্না শীল এই স্কুলের শিক্ষিকা। তিনি ৪ বছর ধরে স্কুলটিতে শিক্ষকতা করছেন। এই স্কুলে সকল শিক্ষার্থীর পড়ার বয়স ৪-৬ বৎসরের মধ্যে।

একটি অংশীদারিত্ব শিশু বিকাশ সহায়ক কার্যক্রমের আওতায় সমাজে পিছিয়ে পড়া ও বিপদাপন্ন এলাকার হতদরিদ্র পরিবারের শিশুদেরকে প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশের প্রস্তুতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে, ঝড়ে পড়ার হার কমানো এবং শিক্ষার গুনগত মান অর্জন করার লক্ষ্যে শিক্ষার অধিকার পূরণ ও নিরাপদ পরিবেশের মধ্য দিয়ে শিশুদের শারিরীক, মানষিক ও সৃজনী শক্তির বিকাশে সহায়তার লক্ষ্যে শিশুদেরকে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যাওয়া ও প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিখন যোগ্যতা অর্জনের জন্য প্রস্তুত করে তোলাই সংস্থার মূল লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য।

হাটহাজারী উপজেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলের অবহেলিত সুবিধা বঞ্চিত শিশুরা খুঁজে পেয়েছে তাদের শিক্ষার নতুন ঠিকানা। সমাজে দরিদ্র, ছিন্নমূল কোনো কোনো শিশু স্কুল কি তা জানে না, বোঝে না। এই উপজেলার মেখল, মির্জাপুর, ছিপাতলী, গুমানমর্দ্দন, নাঙ্গলমোড়া ইউনিয়ন ও হাটহাজারী পৌরসভা এরিয়ায় মোট বর্তমানে ১২টি শিখন শিকড় কেন্দ্রে ২৪০ জন শিশুর জীবনের চাকা পাল্টে যাচ্ছে। তারা এখন তাদের শিক্ষার অধিকার পাচ্ছে। এতে তাদের মেধার বিকাশ ঘটছে। ওয়ার্ল্ড ভিশনের শিখন শিখড় কার্যক্রম দীর্ঘদিনের।

শিশুদের বই, খাতা, কলম, রং পেন্সিল, খেলনা, ছবি কার্ড ইত্যাদি সবই দেয়া হচ্ছে। ওরা ছবি আঁকে নানান গাছের পাতা আর প্রাকৃতিক রং দিয়ে। ছবিগুলো তারা ঘরের কোনে সাজিয়ে রেখেছে। তারা ছড়া, গান, কবিতা আবৃত্তি নানান কৌশলে শিক্ষা গ্রহণ করছে। এরই পাশাপাশি শিশুদেরকে শিশু সুরক্ষা, প্রাথমিক স্বাস্থ্য পরিচর্যা ও বাংলাদেশে ভয়াবহ দুর্যোগ (ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ভূমিকম্প, খরা, অগ্নিকান্ড) নাম বলতে এবং দুর্যোগের সময় তাদের কি কি করা উচিৎ এবং কি করা উচিত নয় এবং তা “শিশুদের জন্য বিভিন্ন পাজেল” উপকরণ ব্যবহারের মাধ্যমে শিক্ষিকা শিশুদেরকে শিখাতে সহায়তা করছে।

প্রাথমিক শিক্ষায় প্রবেশের প্রস্তুতি নিশ্চিত করার মাধ্যমে ঝড়ে পাড়ার হার কমানো এবং শিক্ষার গুনগত মান অর্জন করার লক্ষ্যে শিক্ষার অধিকার পূরনে কেন্দ্রের শিক্ষিকা রুটিন মাফিক পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিষয় আলোচনায় শিশুদেরকে দলে ভাগ করে দিয়ে এলোমেলো করা ছবি ও লেখা সম্বলিত পাজেলের টুকরোগুলোতে লেখা বাক্যগুলো আকর্ষনীয় উপস্থাপনের মাধ্যমে তাদের মনোভাগ জাগিয়ে তুলতে শিক্ষিকা সহায়তা করছে।

তাদের কাছে স্কুলটি খুবই আনন্দের এবং প্রিয়। এতে তাদের মধ্যে শিক্ষার জন্য আগ্রহের কমতি নেই। ওরা খুবই সু-শৃঙ্খল, দরদী এবং সম্মানজনক আচরণে বিশ্বাসী। তা তাদের মধ্যে মেধা বিকাশে সাহায্য করছে। তাদের আনন্দ, হৈ-চৈ, হুলোড় শুনে আশ পাশের লোকজন আসে তাদের দেখতে। অভিনব কলাকৌশল, সর্বাধুনিক পদ্ধতি এই স্কুলগুলো স্থানীয় জনগনের মধ্যেও সাড়া জাগিয়েছে এবং আগ্রহের সৃষ্টি করছে।

গুমানমর্দ্দন ইউনিয়নের ইউপি চেয়ারম্যান মুজিবুর রহমান বলেন, প্রাক-প্রাথমিক স্কুলগুলোর শিক্ষার কৌশল এবং পদ্ধতি প্রাথমিক শিক্ষার জন্য একটি সফল মডেল হতে পারে। দেশের প্রতিটি গ্রামে এ ধরণের স্কুলের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কারণ শিশুর সৃজনশীলতা ও বুদ্ধির বিকাশ ঘটানো এবং আদর্শ কার্যকর শিক্ষা বিস্তারের জন্য প্রাক-প্রাথমিক শিক্ষা পদ্ধতি একটি অনন্য মডেল।