“স্মৃতির পাতায় আমার কলেজ”

প্রকাশিত: ১১:৫১ পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৭, ২০১৯ | আপডেট: ১১:৫৩:পূর্বাহ্ণ, নভেম্বর ৭, ২০১৯
“স্মৃতির পাতায় আমার কলেজ”

এইতো সেদিন ২৬ জুন ২০১১ প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছিলো বাহিরে। কিন্তু মনের মধ্যে একটা অজানা আনন্দের সেতার বাঁজছিল। স্কুল জীবনের গন্ডি পেরিয়েছি, সেদিন আমার কলেজে ভর্তি হওয়ার দিন। কি যে এক অজানা আনন্দ আমাকে নাড়া দিচ্ছিলো, মনে হয় যেন সদ্য প্রস্ফুটিত পাখির ছানার মতো এক চঞ্চলা অনুভূতি। বৃষ্টির মধ্যে রিক্সায় করে কলেজে রওয়ানা হলাম আমি ও আমার মা।

আজ আমি আমার স্বপ্নের সেই “চরফ্যাসন সরকারি কলেজ” এ ভর্তি হতে যাচ্ছি। স্কুল জীবনটা শেষ হওয়ার পর মনে হল নদী পেরিয়েছি। এবার যে সমুদ্রে নামবো। সেই সমুদ্রের বিশালতার কথা কল্পনা করতে করতেই রিক্সা এসে থামলো আমার কলেজ গেটে। আনন্দে আপ্লুত হয়ে পা রাখলাম কলেজের বারান্দায়। কে ছাত্র, কে শিক্ষক, কোন বিষয়ের শিক্ষক সবই ছিল অজানা। অবশেষে যার কাছে ভর্তির ফরম পূরন করলাম তিনি প্রিয় “শাহানুর বিউটি” ম্যাডাম। সমাজকল্যাণের প্রভাষক। তিনি শুধু আমার শিক্ষিকাই নয় এক পর্যায়ে ওনার সাথে রিলেশনটা বোন আর বান্ধবীর মতো হয়ে যায়।

না বললেই নয়, বিউটি ম্যাডাম এমন একজন মানুষ ছাত্র-ছাত্রীরা তাকে শুধু শিক্ষিকা নয় বন্ধু মনে করে। আকাশের মতো বিশাল তার হৃদয়টা, হাসিখুশি আর মিশুক স্বভাবের একজন মানুষ। খুব ভালবাসি বিউটি ম্যাডামকে। যাইহোক এরপরের কথা বলি। ভর্তির কাজ শেষ। বলছি এবার ২রা জুলাই ২০১১ এর কথা। সেদিন ছিল একাদশ শ্রেণীর প্রথম ক্লাস (ওরিয়েন্টেশন)। সকল শিক্ষক-শিক্ষিকা আর ছাত্র-ছাত্রীদের সাথে পরিচয় হওয়ার এক স্মরণীয় দিন। অনেক উৎফুল্লতার সাথে অতিবাহিত হচ্ছিল একেকটি দিন। লিখতে গিয়ে বারবার হারিয়ে যাচ্ছি সেই স্বর্ণালী দিনের পৃষ্ঠায়। আবার যদি ফিরে পেতাম সেই বর্ণীল দিনগুলো।

নাহ্ আর আবেগে আপ্লুত হলে চলবেনা। আজ যে লিখতে বসেছি জীবনের সেই বাঁধহীন, চঞ্চলা, স্বর্ণে মোড়ানো আমার কলেজ স্মৃতি। আমার বর্ণীল শিক্ষা জীবনে আমি পেয়েছি শিক্ষকদের অতুলনীয় ভালবাসা, উৎসাহ, সহযোগিতা। আজ আমার কলম চাইছে আমার প্রতিটি প্রিয় শিক্ষকের কথা লিখতে।

প্রথমেই বলতে চাই যেই কলেজের স্মৃতি আমায় পেছন থেকে হাতছানি দিচ্ছে, যেই কলেজের ইট-পাথরের মায়ায় বাঁধা পরেছে এই মন, সেই কলেজের অধ্যক্ষ আমার প্রিয় শিক্ষাগুরু সদা হাস্যজ্জ্বল, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিমনা, সমাজে, রাজনীতিতে যার অনন্য অবদান, চরফ্যাসন সরকারি কলেজের নতুন/প্রাক্তন হাজারো শিক্ষার্থীর প্রিয় শিক্ষক, চরফ্যাসনের সূর্য সন্তান, সুদক্ষ অধ্যক্ষ জনাব কয়সর আহমেদ দুলাল স্যার। যিনি একাধারে আমার শিক্ষক, অভিভাবক, বন্ধু, শুভাকাঙ্খী। নিরহংকার মনের একজন সাদা-মাটা মানুষ। চরফ্যাসন সরকারি কলেজের প্রাণ স্বরুপ।

আমরা জানি একটি বৃক্ষের চারা রোপনের পর যথেষ্ট যত্নের মাধ্যমেই তা একসময় বড় হয়। তেমনি এই কলেজের প্রতি দায়িত্বশীলতা, ভালবাসা ও নিষ্ঠার সাথে কলেজের প্রতিটি কাজ গুছিয়ে সঠিকভাবে পালন করে এ কলেজকে উন্নতির দিকে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টায় সফল হয়েছেন তিনি। দ্বীপজেলা ভোলার অন্যতম বিদ্যাপীঠ, বরিশাল বিভাগ থেকে কয়েকবার পুরষ্কার পেয়েছে এই কলেজ। চরফ্যাসন মহাবিদ্যালয় থেকে হয়েছে “চরফ্যাসন সরকারি কলেজ”।

উন্নয়নের ছোঁয়ায় কলেজটিকে পরিপূর্নতা দিতে চরফ্যাসনের উন্নয়নের মানসপুত্র জনাব আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব এম.পি মহোদয়ের অবদান তো কোনোদিনও কোনো যুগেও ভোলার মতো নয়। তিনি উন্নয়নের জন্ম দিয়েছেন আর কয়সর আহমেদ দুলাল স্যার তা বাঁচিয়ে রাখতে মেধা, শ্রম আর চেষ্টা দিয়েছেন। আমার অনিন্দ্য সুন্দর শিক্ষা জীবনে আমি স্যারের উৎসাহ, আশীর্বাদ, ভালবাসা পেয়েছি সবসময়। আবেগতাড়িত মন স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে আরও অনেক প্রিয় শিক্ষকের কথা। যাদের কথা না বললেই নয়।

মনে পড়ছে শ্রদ্ধেয় হোসাইন মুহাম্মদ জাকির স্যারের কথা। প্রভাষক ইংরেজি।
মোহাম্মদ উল্লাহ্ স্যার, প্রভাষক বাংলা।
এমদাদ হোসেন শাহিন স্যার, প্রভাষক সমাজকর্ম।
শাহানুর বিউটি ম্যাডাম, প্রভাষক সমাজকল্যাণ।
মিজানুর রহমান স্যার, প্রভাষক রাষ্ট্রবিজ্ঞান।
মুনীর হোসাইন স্যার, প্রভাষক রাষ্ট্রবিজ্ঞান।
স্বপন কুমার ঘোষ স্যার, প্রভাষক ম্যানেজমেন্ট।
শুভ্র মনির স্যার, প্রভাষক ইতিহাস।
জাবেদ হোসাইন স্যার, প্রভাষক সমাজকর্ম।
নজরুল ইসলাম স্যার, প্রভাষক সমাজকর্ম।
জোনাকি রানী ম্যাডাম, প্রভাষক সমাজকর্ম।
সেলিনা রুবি ম্যাডাম, প্রভাষক বাংলা।

আরও অনেক অনেক প্রিয় শিক্ষক রয়েছেন আমার। নামের তালিকা টা শেষ হতে চাচ্ছে না। ওনারা প্রত্যেকেই আমাকে ভালবাসা, আশির্বাদ দিয়ে পরিপূর্ণ করেছেন আমার শিক্ষা জীবন। তাদের অবদান অপরিসীম। পৃথিবীর যে প্রান্তেই থাকি তাদের স্থান আমার হৃদয়ে সম্মানের সাথে চিরদিনই একইভাবে অটুট থাকবে।

হয়তো সময়ের প্রবহমান স্রোতের অতলে একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে জীবনের অনিন্দ্য সুন্দর দিনগুলো। স্মৃতির এ্যালবাম ভারী হচ্ছে জীবন থেকে বিয়োগ হওয়া স্বর্ণালী দিনগুলো দিয়ে। জীবনের বহুরৈখিক পথে শিক্ষাজীবন এক সমুজ্জ্বল অধ্যায়।

সময়ের পরিক্রমায় হয়তো জীবনের প্রেক্ষাপট বদলায় তবু রয়ে যায় কিছু সাদা-কালো স্মৃতি হৃদয়পটে। সময় যেন এক প্রবহমান মহাসমুদ্র। পৃথিবীতে সবচেয়ে নিষ্ঠুর হল “সময়”।

লিখছি ঠিকই তবু চোখের কোনে আজ অশ্রুকণার আনাগোনা। সেই প্রিয় অনার্স ভবন, প্রিয় কদমতলা, বর্ণীল ফুলের বাগানটা কি ভুলে গেছে আমায়? নাকি আমার শুন্যতায় বিষন্নতায় স্থবির হয়ে আছে? তারাও কি অতীতকে ভেবে গুমরে গুমরে কাঁদে সকলের অগোচরে?

মনে পড়ছে, খুব মনে পড়ছে ১৮ই ডিসেম্বর ২০১১ ইং দিনটার কথা। সেদিন ছিল আমাদের ইন্টারমিডিয়েটের ব্যাচের নবীন বরন অনুষ্ঠান। সেই গানের স্টেজ, গান গেয়ে শত শত মানুষের হাত তালি পাওয়ার অনুভূতি টা যেন আজও আমায় আবেগাপ্লুত করে। সেদিনই জীবনে প্রথম স্টেজে গান গেয়েছিলাম। আমাকে গান গাইতে উৎসাহ দিয়ে স্টেজ পর্যন্ত পৌছানোতে যাদের অবদান চেষ্টা, পরিশ্রম অতুলনীয় ভুমিকা রেখেছিল তাদের কথা যে না বললেই নয়। তারা হলেন- আমার বাবা মোঃ সানাউল হক বাদল, শ্রদ্ধেও আবু তাহের স্যার, স্বপন কুমার ঘোষ স্যার, হাসান মাহমুদ স্যার।

এছাড়া কলেজের আরও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ, খেলাধুলায় পুরস্কার লাভ করা, কলেজ ম্যাগাজিনে লেখালেখি, কলেজের অভ্যন্তরীন প্রতিটি প্রোগ্রামে উপস্থিত থাকার সেই দিনগুলো কোনোটাই যেন ভুলবার মতো নয়।

ছাত্রী হিসেবে নিজের কথা বলতে গেলে প্রথমেই বলতে চাই আমি বরাবরই পড়ালেখাকে গুরুত্ব দিয়েছি। পাঠ্যবইয়ের বাহিরেও সৃজনশীল চিন্তাধারায় নতুনত্ব তৈরি করা, নিজের মধ্যে লুকিয়ে থাকা প্রতিভাকে খু্ঁজে বেড়ানো ছিল আমার নেশা।

২০১৩ সালে চরফ্যাসন সরকারি কলেজ থেকে “A” গ্রেড নিয়ে এইচ.এস.সি পাশ করি, এরপর ২০১৭ তে ফার্স্ট ক্লাস অর্জন করি অনার্স কোর্সে। এখানেও একটা ছোট্ট গল্প আছে। যেদিন চার বছরের অনার্স কোর্স শেষে ভাইভা হয়েছিল আমাদের, সেই দিনটাও ছিল আরও একটি স্বরনীয় দিন। আমাদের ভাইভা বোর্ডের পরীক্ষক ছিলেন বরিশাল বি.এম কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের বিভাগীয় প্রধান জনাব সবুর হাওলাদার স্যার। যিনি আমার ভাইভা নিয়ে অত্যন্ত স্যাটিসফাইড হয়ে বলেছিলেন – ” আমরা এরকম স্টুডেন্টই চাই, তুমি অবশ্যই বিসিএস দিও”।

ভাইভাতে কলেজের মধ্যে সর্বোচ্চ মার্কস আমি পেয়েছিলাম। কলেজ জীবনের শুরু থেকে শেষ অবধি যেন আমার সঙ্গে ছিল এক বিমূর্ত আশীর্বাদ, মহান আল্লাহর অশেষ রহমত, বাবা-মায়ের অনুপ্রেরণা/দোয়া, শিক্ষকদের অতুলনীয় ভালবাসা, উৎসাহ, আন্তরিকতা, দোয়া।

ভালবাসি খুব ভালবাসি ঐ চরফ্যাসন সরকারি কলজেটাকে আমি। হ্যাঁ রবি ঠাকুরের গীতাঞ্জলি থেকে নয়, নজরুলের অগ্নিবীণা থেকে নয়, শরৎ বাবুর দেবদাস থেকেও নয়, আমার অন্তরের অন্তঃস্থল থেকে বলছি- “চরফ্যাসন সরকারি কলেজ আমার স্বপ্নের রাজমহল, আমার হৃদয় নিংড়ানো ভালবাসার ক্যাম্পাস, আমার স্মৃতির পৃষ্ঠায় এক স্বর্ণালী অধ্যায়।”

লেখকঃ সাদিয়া আক্তার মুনিয়া
প্রাক্তন ছাত্রী
চরফ্যাসন সরকারি কলেজ।