শৈশব স্মৃতিতে অধ্যক্ষ নজরুল স্যার…

নেসার নয়ন নেসার নয়ন

লেখক ও শিক্ষক

প্রকাশিত: ১০:৩৯ পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯ | আপডেট: ১০:৩৯:পূর্বাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১৭, ২০১৯
শৈশব স্মৃতিতে অধ্যক্ষ নজরুল স্যার…

এই প্রত্যন্ত জনপদের কিংবদন্তী পুরুষ, প্রথিতযশা শিক্ষাবিদ, সমাজ সেবক, রাজনীতিবিদ, এ এলাকা থেকে দুই দুই বার নির্বাচিত সাবেক সাংসদ মরহুম অধ্যক্ষ মিয়া মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম। যাকে কৈশোরে দেখেছি অনেক কাছ থেকে। ব্যক্তি অধ্যক্ষ এম এম নজরুল ইসলাম তিনি আজ আমাদের মাঝে নেই কিন্তু আমার শৈশব স্মৃতিতে তিনি আছেন অমলিন হয়ে।

প্রথম দেখা ১৯৯২ প্রথম দিকে এওয়াজপুরের পানিরকলে ডাবল মার্ডার (বাদী কাদের মাঝি, বিবাদী কাউছার মিয়া গং) মামলার তদন্ত কালে তখন রাত ৮টা ৩০ মিনিট। আমি তখন খুব ছোট ছিলাম তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ি । আমি বড়দের সাথে ছুটে যাই স্যারকে এক নজড় দেখার জন্য। ছোট বেলায় প্রথম যে শ্লোগান শিখি সেটাই ছিল স্যারকে নিয়ে “চরফ্যসনের গোলাপ ফুল অধ্যক্ষ নজরুল “।

তদন্তস্থানে স্যারের জন্য একটি চেয়ার এবং একটি টেবিল দেয়া হলো। আর বাকী সকলে দাড়িয়ে স্যারের কথা শুনছে এবং হত্যার ঘটনার বিবরন দিচ্ছে। ছোট ছিলাম বলে দূর থেকে কিছুই শুনতে ও দেখতে না পেয়ে ফাঁক দিয়ে আমি স্যারের টেবিলের কাছে ডুকে যাই। আমি খুব ছোট ছিলাম বলে স্যার আমাকে দেখতেই সহজ সারল্যে ভরা আলাপচারিতায় আপন করে নিয়ে বাড়ি এবং বাবার নাম জিজ্ঞেস করলেন। আমি স্যারের প্রশ্নের উত্তর দিলাম। স্যার আমাকে স্নেহ মমতায় গায়ে হাত বুলিয়ে বললো, “ছোটরা এতো রাতে বাড়ির বাহিরে থাকতে নাই, যাও বাড়ি যাও পড়তে যাও।” আমি বাড়ি চলে আসি। সে থেকে আমি স্যারের উপদেশ অদ্যাবধি মেনে চলছি। এখনও রাতে প্রয়োজন ছাড়া আর বড়ির বাহিরে থাকিনা।

এখন আমি পড়াশুনা শেষ করে একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছি। আমার ছোট বেলার স্মৃতিতে তার মাঝে দেখেছি এক নিরহংকার মানুষের প্রতিচ্ছবি। দেখেছি মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য কিছু করার চেষ্টা। দেখেছি দুর্নীতি অব্যবস্থাপনার প্রতি ক্ষোভ। আমার ছোট অভিজ্ঞতায় তিনি ছিলেন প্রকৃত পক্ষে একজন সৎ এবং সাদা মনের মানুষ। তখন তিনি চরফ্যসন – মনপুরা’র সাংসদ ছিলেন। সে রাতে দেখেছি অগনিত সমস্যায় জর্জরিত মানুষের ভীড়। উন্মুক্ত ছিল সবার জন্য সমস্যার কথা বলার। জীর্ণ মানুষের সাথে স্যারকে দেখেছি বসে এক কাপ চা খেতে। এসব মানুষের ভীর সামলাতে তার ব্যস্ততা ছিল সীমাহীন। এতসব মানুষের সমস্যা, সব কিছু নিজেই দেখতেন তার কোন ব্যক্তিগত সহকারী ছিল না। এক জন জিজ্ঞেস করেছিলো, “কি করে স্যার আপনি এত সব মানুষের সমস্যা সমাধান করেন?” তিনি জবাবে বলেন,”ওরা সবাই গরিব মানুষ, আমি না দেখলে ওরা যাবে কোথায়? আমার কাছে ওদের প্রত্যাশা অনেক। ওরাই আমার আপনজন। ওদের জন্যই আমি নিজেকে নিয়োজিত রাখতে চাই। আর বাড়ির সব কিছুই সামলে রাখেন তোমাদের ভাবী ( আমাদের রত্নগর্ভা মা রহিমা ইসলাম)।”

বড় হয়ে শুনেছি, এই সহজ -সরল মানুষটি ১৯৬৯ এ পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কমিশন পদে নিয়োগ পেয়েও তিনি থেকে গেলেন এ জনপদের মানুষ কে ভালোবেসে চরফ্যসন কলেজের অধ্যক্ষ হয়ে। তিনি ছিলেন আপাদমস্তক একজন ভালো মানুষ। হঠাৎ ৪ সেপ্টেম্বর, ১৯৯২ শুনে ছিলাম স্যার অসুস্থ। ১৩ দিন অসুস্থ থাকার পর ঢাকার সোহরাওয়ার্দী হাসপাতালে ১৭ সেপ্টেম্বর রাত ১২টা ১০ মিনিটে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে আমাদের থেকে চির বিদায় নিলেন। আল্লাহ ওপারে ভালো মনের মানুষটিকে ভালো রাখুন।

স্যার কে সমাধিস্থ করা হয় চরফ্যসন কলেজ চত্ত্বরের পশ্চিম পাশে (প্রধান গেট সংলগ্ন)। তার মরদেহ বহনকারী হেলিকপ্টারের পাইলট শোকাহত লাখো জনতার ঢল দেখে মন্তব্য করেন- “নজরুল ইসলাম জনতার জন্য এমন কী করেছেন, যে তারা পাগলের মতো হয়ে গেছেন। কর্ম জীবনে বহু নেতার মরদেহ নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় গিয়েছি কিন্তু কোথাও এতো লোক দেখিনি।”

তার অনেক দিন পরের কথা ১৯৯৮ তে এস এস সি পাশ করে চরফ্যসন কলেজে (বর্তমানে চরফ্যাসন সরকারি অনার্স কলেজ) ভর্তি হই। ভর্তি হওয়ার দিনে কলেজে পৌঁছে স্যারের কবরের কাছে যাই। নীরবে দাঁড়িয়ে ফাতেহা পাঠ করি অশ্রুসজল চোখে। আমার বাবাও স্যারের ছাত্র ছিলো। ইচ্ছে ছিলো, আমিও স্যারের কাছে পড়বো। এবং স্যারকে বলবো স্যার আমি আপনার উপদেশ মেনে ভালো রেজাল্ট করে, অাজ কলেজ পর্যন্ত এসেছি। আপনি আমাকে আরো দোয়া করবেন আমি যেন উচ্চ শিক্ষা অর্জন করতে পারি।

আজও স্যারের কথা মনে পড়লে চোখের কার্নিশে বেয়ে গড়িয়ে পড়ে জলের ফোঁটা। নস্টালজিয়ায় ভুগি। তন্মধ্যে এটা আশার আলো, স্যারের জ্যেষ্ঠপুত্র আজ লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধি। বুদ্ধিদীপ্ত, সৌম্যদর্শন আবদুল্লাহ আল ইসলাম জ্যাকব শুধু বিপুল ভোটে বিজয়ী সাংসদই নয়, প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার অতি স্নেহের জ্যাকব আজ একজন সফল নেতা, ডিজিটাল সাংসদ, যুব ক্রীড়া মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি এবং সাবেক উপমন্ত্রী । আমাদের আনন্দ আজ এইজন্য যে, আমাদের প্রিয় নেতা, প্রিয় জ্যাকব ভাই আজ আমাদের মাথার উপর বটবৃক্ষের মত স্থির, অচঞ্চল, অবিচল।

পরিশেষে আমি এই জনপদের লাখ লাখ জনতার প্রাণপ্রিয় ব্যক্তিত্ব, নিপীড়িত, নির্যাতিত, অবহেলিত মানুষের ভাগ্য উন্নয়নের প্রানপুরুষ, বিশিষ্ট সমাজ সেবক, শিক্ষানুরাগী, রাজনীতিবিদ, প্রাজ্ঞ জননেতা, প্রথিতযশা শিক্ষক, প্রাাক্তন জাতীয় সংসদ সদস্য চরফ্যসন কলেজের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যক্ষ মিয়া মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম স্যারের ২৭ তম মৃত্যু বার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার সাথে স্মরণ করছি। এবং স্যারের জন্য সকালের কাছে দোয়া চাচ্ছি।

লেখক: নেসার নয়ন
nesar.nayon@gmail.com
https://twitter.com/nesarnayon
https://www.instagram.com/nayonnesar
https://www.facebook.com/nesarnayon2
+88 017 11 84 35 08