অনিয়ম আর দুর্নীতি করেই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন দৌলতখান হাসপাতালের ‘চন্দন সূতার’!

দৌলতখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স

প্রকাশিত: ৮:৫৯ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯ | আপডেট: ৯:০৭:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১১, ২০১৯
অনিয়ম আর দুর্নীতি করেই সম্পদের পাহাড় গড়েছেন দৌলতখান হাসপাতালের ‘চন্দন সূতার’!

ভোলার দৌলতখান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপ-সহকারি কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার (সেকমো) চন্দন সূতারের কাছে জিম্মি হয়ে পড়েছে সেখানে চিকিৎসা নিতে আসা সাধারণ রোগীরা। গত সাত বছর ধরে হাসপতালে থেকে অনিয়ম আর দুর্নীতি করে ঢাকা-বরিশালে ফ্লাটবাসাসহ গড়ে তোলেছেন কোটি কোটি টাকার সম্পদের পাহাড়।

সেকমো পদটি তৃতীয় শ্রেণীর হলেও চন্দন সূতার নিজেকে রোগীদের কাছে ডাক্তার বলে পরিচয় দিয়ে থাকেন। “ডা. চন্দন সূতার” নামের তার নিজস্ব চিকিৎসা ব্যবস্থাপত্রও রয়েছে। এ পরিচয়ে সে প্রতিদিন হাসপাতালের সামনে রহমান ফার্মেসীতে বসে রোগী দেখেন। ব্যবস্থাপত্রে সে নিজেকে মেডিসিন ও সার্জারী বিষয়ে অভিজ্ঞ দাবি করেন। রহমান ফার্মেসী নামের একটি নিজস্ব চেম্বারে সকাল ৯টা থেকে দুপুর ২টা ও বিকেল ৪টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত রোগী দেখেন সে।

এছাড়াও হাসপাতালটিতে একজন টিএস ও তিন জন মেডিকেল অফিসার থাকা সত্বেও সে প্রতিদিন হাসপতালের ইমার্জেন্সিতে বসে নিজেকে ডাক্তার পরিচয়ে হাড় ভাঙ্গা ও কাটাছেড়া রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে থাকেন। আর তার দালাল বাহিনীর মাধ্যমে রোগীদের কাছ থেকে হাজার হাজার টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ করেছেন সাধারণ রোগীরা।

চন্দন সূতার জরুরী বিভাগে রোগীদের নাম ঠিকানা এন্ট্রি করার কথা থাকলেও টাকার বিনিময়ে সে রোগীদের চিকিৎসাপত্র দেয়াসহ কাটাছেড়া ও হাড় ভাঙ্গা রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। রোগীদের কাছ থেকে সর্বনি¤œ এক হাজার এবং সর্বোচ্চ ৫ হাজার টাকা ভিজিট নেয়ারও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তার এসকল কর্মকান্ডে সহযোগীতার জন্য রয়েছে বিশাল বড় দালাল চক্র। তারা রোগীদেরকে বিভিন্নভাবে বুঝিয়ে তার কাছে নিয়ে আসেন। রোগীদের কাছ থেকে টাকা আদায় করার কাজ করেন তার সহকারি ওই হাসপতালের ঝাাড়–দার (বর্তমানে পাম্প চালক) মো. জসিম উদ্দিন। সেও চন্দনের সাথে ব্যান্ডেজ ও সেলাইয়ের কাজ করেন জরুরী বিভাগে।

হাসপতালে রক্তসহ সকল টেস্টের ব্যবস্থা থাকার পরও চন্দন কমিশনের (টাকা) জন্য রোগীদেরকে অপ্রয়োজনীয় টেস্ট দিয়ে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পাঠায়।

চন্দন সূতার ২০১২ সালে উপ-সহকারি কমিউনিটি মেডিকেল (সেকমো) হিসেবে যোগদান করেন দৌলতখান হাসপতালে। এর পর থেকেই সে আস্তে আস্তে নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিতে থাকেন। আর এ পরিচয়ই সে হাসপতালে বসে বিভিন্ন অনিয়ম করে যাচ্ছে। তার বিভিন্ন অনিয়ম আর দুর্নীতির বেশ কয়েকবার তদন্ত হয়েছে। কিন্তু তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেয়া হয়নি। যার ফলে সে বহাল তবিয়তেই সে সকল প্রকার অনিয়ম করে যাচ্ছে।

চন্দনকে ভালো ডাক্তার হিসেবে প্রাচারের জন্য তার কিছু ভাড়াটে লোক রয়েছে। হাসপাতালে কোনো লোক আসলেই তাদেরকে ডেকে আনেন চন্দন। দালাল চক্র চন্দনের বিভিন্ন সুনাম করতে থাকেন।

সে নিজেকে ডা. দাবি করে চেম্বারের নামে প্যাড ছাপিয়ে চিকিৎসা সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। যদিও স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বিধি মোতাবেক এমবিবিএস ছাড়া কেউ নামের সাথে ডাক্তার লিখতে পারবে না। চন্দনের বিরুদ্ধে হাসপতালে রোগী ভর্তি করিয়ে ৫টাকার স্থলে ২০০ টাকা নেয়া ও রোগীদেরকে ভুয়া মেডিকেল সার্টিফেট দেয়ারও অভিযোগ রয়েছে। এক কথায় তার একক অধিপত্বের কারণে দৌলতখান হাসপাতালে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা রোগীরা তার কাছে জিম্মি হয়ে পড়ছে। টাকা দিতে না চাইলে সে রোগীদেরকে এই বলে প্রেসার করেন যে, ভোলায় গেলে গাড়ী ভাড়া, ডাক্তারের ভিজিট ও অন্যনা খরচসহ আপনাদের কত খরচ হতো? তাহলে আমাকে টাকা দিবেন না কেনো।

গত সোমবার সরেজমিনে হাসপতালে গিয়ে দেখা যায়, চন্দন সূতার হাসপতালের জরুরী বিভাগে বসে রোগীদের চিকিৎসা দিচ্ছেন। রোগীদের বিশাল লাইন রয়েছে তার রুমের সামনে। তবে সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে চন্দন রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেয়া বন্ধ করে দেয়। সাথে সাথে চলে আসে তার ভাড়াটিয়া বাহিনী। তারা এসে চন্দনের সুনাম বলতে থাকেন। এবং হাসপাতালের ভিতর হৈ-চৈ করতে থাকে। তাদেরকে ক্যামেরার সামনে কথা বলতে বলা হলে তারা কেউ কথা বলতে রাজি হয়নি। তাদের ভয়ে অনেক ভুক্তভোগী রোগী অভিযোগ দিতেও রাজি হয়নি।

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন মো. আইয়ুব আলী নামের এক রোগী বলেন, সে তিন দিন ধরে এখানে ভর্তি রয়েছে। তার হাত কাচের সাথে কেটে গেলে সে হাসপাতালের জরুরী বিভাগে আসেন। কিন্তু চন্দনের লোকজন তাকে ৫হাজার টাকা দিতে বললে সে টাকা দিতে অপারগাত জানান। টাকা দিতে না পারায় তাকে ওই অবস্থায় প্রায় দুই ঘন্টা হাসপতালে বসিয়ে রাখা হয়। সর্বশেষ সে এক হাজার ৮ শত টাকা দিলে তার হাত সেলাই করে ব্যান্ডেজ করে দেয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে আরেক রোগী বলেন, এই হাসপতালে চিকিৎসা নিতে হলে প্রতিটি পদে পদে চন্দন সূতারকে টাকা দিতে হয়। না হয় সে কোনো কাজ করেনা।

সেবা নিতে আসার আরেক রোগী বলেন, আজকে আপনাদেরকে দেখে কোনো টাকা নেয়া বন্ধ করে দিয়েছে। তবে অন্য সময় টাকা ছাড়া কোনো সেবা পায় না তারা।

চন্দন শুতার হাসপাতালের সামনের একটি ফার্মেসীতে চেম্বার করেন। অফিস টাইমেও তাকে চেম্বারে দেখা যায়।

এসকল ব্যাপারে উপ-সহকারি কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার চন্দন সূতারের কাছে জানতে চাইলে তিনি কোনো কথা বলতে রাজি হননি। তিনি বলেন, এসকল ব্যবাপারে আমার টিএস জানে।
দৌলতখান হাসপাতালের টিএস ডা. মো. আনিচুর রহমান বলেন, আমি দুদিন ধরে এ দায়িত্বে এসেছি। চন্দনের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ সেগুলোর ব্যাপারে আমি সিভিল সার্জনের সাথে কথা বলে ব্যবস্থা নিবো।

ভোলার সিভিল সার্জন ডা. রথিন্দ্রনাথ মজুমদার বলেন, চন্দন সূতারের এসকল অনিয়মের বিষয়ে আমি অবগত হয়ে গত কয়েক মাস আগে তাকে ডেকে এনে সতর্ক করে দিয়েছি। এবং তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে জাননো হয়েছে।