আমার ফেলে আসা দিনগুলো…

নেসার নয়ন নেসার নয়ন

লেখক ও শিক্ষক

প্রকাশিত: ১০:০২ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯ | আপডেট: ১১:৫৬:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ১০, ২০১৯
আমার ফেলে আসা দিনগুলো…

জীবনের ছোট্ট গণ্ডি পেরিয়ে তখন বিশালত্বের স্বাদ পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। অনেক স্বপ্ন নিয়ে পা রেখেছিলাম কলেজ আঙ্গিনায়। মনে হয় এই তো সেদিনের ঘটনা। কত অজস্র স্মৃতি জড়িয়ে আছে এই কলেজের আঙিনা জুড়ে, তা লিখলে একটা মহাকাব্য হয়ে যাবে হয়ত। কালের তরীতে ভেসে সেই সোনালি দিনগুলো হারিয়ে গেছে। শৈশব-কৈশোর ও যৌবনের ফেলে আসা দিনগুলি জানি আর কখনো আসবে না ফিরে, তাতে কী? মধুময় সেই অতীত স্মৃতি, কে পেরেছে ভুলতে কবে? সত্যিই জীবনের ক্যানভাসে এমনকিছু স্মৃতির ছবি আঁকা হয়ে যায়, যা ভোলা যায় না কখনোই। বিশেষ করে চিরচঞ্চল বয়সের দূরন্ত কৈশোর সদ্যযৌবনে পা রাখা কলেজ জীবনের কথা।

আমি নেসার নয়ন। ছোট মামার (নোমান সালমান) সাথে ১৯৯৮ খ্রিস্টাব্দে ১৭ বছর বয়সে আমি যে কলেজটিতে ভর্তি হয়েছিলাম, সে কলেজটির নাম চরফ্যাসন মহাবিদ্যালয় বর্তমানে চরফ্যাসন সরকারি কলেজ। কলেজটি কুইন আইল্যান্ড অব বেঙ্গল নামে পরিচিত ভোলা জেলার চরফ্যাসন উপজেলার ৪ নং ওয়ার্ড এ অবস্থিত। সবুজ প্রকৃতিঘেরা কলেজের সামনে রয়েছে এক বিশাল খেলার মাঠ। আশেপাশের সমস্ত শিশু-কিশোরের দল এলাকার যুবকরা প্রতিদিন বিকেলে এবং ছুটির দিনগুলোতে হরেকরকম খেলায় মেতে ওঠে। আর কলেজের পাশে চোখজুড়ানো, ঢেউখেলানো সবুজ আর সবুজ বৃক্ষরাজি।

বিদ্যালয়ের পাঠ চুকালেও এখনও অনেক স্মৃতি মনে গেঁথে রয়েছে। মানুষের জীবনের সবচেয়ে আকর্ষণীয় অধ্যায় হল স্কুল জীবন। আজ বারবার মনে পড়ছে কাশেম গঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের কথা, বিদ্যালয়ের শেষ দিনটির কথা। যেদিন আনুষ্ঠানিকভাবে স্কুলের সাথে আমাদের সম্পর্ক ছিন্ন হয়েছে। সেদিনের অনুভূতি এখনও আমাকে বেদনা দেয়।

একটি ফুল যেমন অংকুর থেকে ফোটার স্বপ্ন দেখে, একটি পাখি যেমন মুক্ত আকাশে স্বাধীনভাবে উড়ার স্বপ্ন দেখে, সবাই যেমন স্বপ্ন দেখে কিছু না কিছু করে দেখাবার, আমিও তেমনি স্বপ্নবাজ মানুষ। যখন আমি ছোট, বুঝতে শিখি, তখনই দেখি আমার জন্যে সব কিছু করতে মানা, ধরতে মানা, শুনতে মানা, মোট কথা আমি যেন গণ্ডীবদ্ধ। মনে মনে তখনই আমার কিছু করার স্বপ্ন জাগে। মনের গভীর পিঞ্জরে লালিত হতে থাকে স্বপ্নগুচ্ছ। এ সব কিছুরই একটাই কারণ মনের স্বাধীনতা চাই; আর আমার ধারণা ছিল সে স্বাধীনতা, আর কিছু করে দেখাবার মুখ্য জায়গা হচ্ছে কলেজ। ছোটবেলায় বড় ভাইদের কাছে শুনেছি কলেজে পড়তে মজাই আলাদা, কেউ ডাক-দোহাই দেয় না, স্যারদের বেতের বাড়ি খেতে হয় না। আবার প্রতিদিন স্কুলের মত কষ্ট করে না আসলেও চলে, তো সে থেকেই কলেজের ব্যাপারে চোখে মুখে ছিল আগত প্রতীক্ষার ছাপ। কখন যে কলেজে পড়তে যাবো তার জন্যে শুরু হলো দিনগোনার পালা। অবশেষে সব কিছু জয় করে কলেজে পড়ার স্বপ্ন আমার সত্যি হলো।

আমি কাশেম গঞ্জ মাধ্যমিক বিদ্যাল থেকে এস. এস. সি. পাস করে ভর্তি হই প্রিয় এই কলেজে। ভর্তির পালা শেষে অধীর আগ্রহচিত্তে প্রহর গুণতে থাকি কখন যে আসবে কলেজের প্রথম দিনটি। অবশেষে এলো সেই দিনটি। দিনটিকে ঘিরে নিজের আনন্দ ও উত্তেজনার কোনো সীমা ছিলো না। সম্পূর্ণ নতুন একটি পরিবেশ, মানুষগুলো সব নতুন, আর নতুন আমার পাঠশালা। কলেজে প্রবেশ করতেই আমাকে স্বাগত জানালো একটি তোরণ, ব্যানার ফেস্টুনসহ অনেক কিছু। মনে তখনই কড়া নাড়লো এই বুঝি শুরু হলো কলেজের মজা।

আস্তে আস্তে কলেজে প্রবেশ করে নির্দিষ্ট ক্লাস রুমে যেতেই দেখি অনেক ছাত্র-ছাত্রী বসে আছে, আমিও গিয়ে তাদের সাথে বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ এদিক-ওদিক তাকানোর পর দেখলাম কলেজের বড় ভাইরা (ফিরোজ কিবরিয়া, জহির রায়হান, পলাশ মাহমুদ, নজরুল কৃষ্ণাণ, যোবায়ের পাটওয়ারী, আল আমিন মাদ্রাজি) ফুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নবীনদের বরণ করার জন্যে। তখন যে কী আনন্দ অনুভব করলাম তা কাউকে বলে বুঝাতে পারবো না। কিছুক্ষণ পর কয়ছর আহম্মদ পরিচিত নাম দুলাল স্যার এসে আমাদের মাঝে স্বাগত বক্তব্য রাখলেন। আমাদের অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিক নির্দেশনা দিলেন। স্যার চলে যাওয়ার পর বড় ভাইদের পক্ষ থেকে গান হলো, নাচ হলো, কৌতুক হলো। আরও কত কি! সবাই পরিচিতির পালা শেষ করলো। প্রথম দিনে কোন ক্লাস হলো না। হলো হাসি-আনন্দ-খুশি।

কলেজের প্রথম দিনটি এভাবেই কেটে যায়। আর ভাবনাতে এলো ছোটবেলায় মনের লালিত স্বপ্ন ও অনুভূতিগুলোর কথা। তা-ই বুঝি সত্যিই হলো সেদিন। কলেজের প্রথম দিন আমার সারাজীবন মনে থাকবে। কলেজে এই প্রথম দিনটির জন্যেইতো কত আগ্রহ চিত্তে বসে ছিলাম, কতইনা পরিকল্পনা ছিল দিনটিকে ঘিরে। সৃষ্টিকর্তার কাছে কৃতজ্ঞচিত্তে শোকরিয়া জ্ঞাপন করছি ওই দিনটি আমার জীবনে দেওয়ার জন্য।

আজ খুব মনে পড়ে কলেজে আমরা ভদ্র, শান্তশিষ্ট থেকে দুষ্ট হয়ে যেতে খুব বেশি সময় লাগত না। বন্ধুদের সঙ্গে নির্দিষ্ট বেঞ্চ, ক্লাসে স্যারদের চোখ ফাঁকি দিয়ে চিরকুট চালাচালি, ক্লাসের পেছন থেকে চিল্লানি। ভদ্র হলেও পাশের বেঞ্চের মেয়েদের দিকে যে নজর যেত না- সেটা বললেও ভুল হবে। ক্লাস ফাঁকিসহ আরো কত কী!

সাজাহান স্যারের ইংরেজি ক্লাস সবাই আগ্রহ নিয়ে শুরু করলেও ফাঁকা ক্লাসে শেষ হতো সময়। কিন্তু কয়ছর আহম্মদ দুলাল স্যারের বাংলা ক্লাসটা কেউ মিস করতে চাইতাম না। শুরু থেকে শেষ অবধি ভর্তিই থাকত তাঁর ক্লাস।

কলেজ ক্যাম্পাস, বন্ধুত্ব, পড়াশোনা, টিউশনি, ক্লাস ফাঁকি, খেলা সব কিছু নিয়ম করে চলতে থাকল। আর চলতে থাকে কলেজ বন্ধুরা মিলে আমাদের টুকরো টুকরো কাজগুলো।

স্কুল ও কলেজ জীবনের আমার বন্ধুরা (মিজান, রশিদ, মাকসুদ, নজরুল, নুরে আলম, আজাদ, জাফর, সজীব শাহরিয়ার, তানভীর, অনন্ত, নোমান সিকদার, রুমা, অকাল প্রয়াত ফারজানা, আসমা, সীমা, হাজেরা মুক্ত, চম্পা, ফেরদাউস, কমলা, হুমায়ুন কবির, মামুন, সবুজ হাওলাদার, আবদুল্লা, মামুন, ইয়ারুল, জুয়েল, ইব্রাহীম কামাল, কবির মোল্লা, জোটন মেম্বার…) সহ আমার বন্ধুরা আমার খুব কাছাকাছি থেকে আমার অনেক উপকার করে এসেছে। আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছি এবং করে যাব আগামী দিনগুলোও। তারা আমার জীবনের অনেক দূর্বলতার কথা জেনে আমি না চাইতেই আমার পাশে এসে দাড়িয়েছে, না চাইতেই তারা যেকোন কাজে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে, না চাইতেই দুনিয়া সম্পর্কে অবগত করার চেষ্টা করেছে । শুধু আর্থিক সহযোগীতা ছাড়া সবধরনের সহযোগীতা করে আসছে দীর্ঘদিন থেকে। আর্থিক সহযোগীতার প্রয়োজন পড়েনি তাই নেয়াও হয়নি হয়তো। চাইলে ও কখনো না করতো না এ আমার বিশ্বাস ছিল ।

যাই হোক; আমিও স্বার্থপরের মতো শুধু নিয়েছিই কিন্তু এতো এতো উপকারের বিনিময়ে দেয়ার মতো কিছুই ছিলনা আমার কাছে আর আজও নেই।

নিঃসন্দেহে বলতে পারি আমার বন্ধুরাই ছিল আমার জীবনের সেরা নিঃস্বার্থ বন্ধু।

এদের কাছ থেকে আমি অনেক কিছু শিখেছি । কিভাবে নিজের আত্মসন্মান বজায় রেখে জীবন কে উপভোগ করতে হয়, কিভাবে অপ্রত্যাশিত কিছু ঘটনাকে সহজভাবে নিতে হয়! জীবনে ঘটে যাওয়া প্রত্যেকটা ঘটনাকেই ইতিবাচক দৃষ্টিতে দেখা ওদের কাছ থেকেই শিখেছি আমি। আমার নেতিবাচক দিকগুলো পরিহার করাতে ওরাই আমায় সাহায্য করেছে। জীবনকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে, মানুষকে ভালোবাসতে শিখিয়েছে। আরো অনেক কিছু, অনেক …অনেক….অনেক কিছু !!

এদের ই দু’একজন আবার হয়তো আমার কাছে কিছু পাওয়ার প্রত্যাশি ছিল। যেমন ভালোবাসার বিনিময়ে ভালোবাসা , উপকারের বিনিময়ে উপকার , সহযোগীতার বিনিময়ে সহযোগীতা। এতো উপকারের বিনিময়ে আমি কী-ই-বা দিতে পারি; তাই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা ছাড়া আমার কিছু করার নেই ।

তোমাদের ঋণ কোনদিন শোধিতেনা পারলেও আশা করি মনে রাখতে পারবো বাকী জীবন। আর শেষ আরো একটা উপকার চাইবো তোমাদের কাছে “পারলে ক্ষমা করো “। ছোটবেলায় খুব দুষ্টু প্রকৃতির থাকলেও বর্তমানে আমি ভীষণ একা থাকা টাইপ একজন মানুষ। কোলাহল, ঝুট-ঝামেলা আর লোকজনের ভীড় সহ্য করতে পারিনা। যার তার সাথে সহজে মিশতে পারিনা। নিজেকে কারো কাছে প্রকাশ করতে পারিনা বলে সব সময় নিজের মত একা একাই থাকি। তাই বলে আমি অবন্ধুসুলভ নই। যারা আমার সাথে বন্ধুর মতো মিশতে পেরেছে তাদের কাছে আমি সদালাপী, পরোপকারী আর বন্ধুবৎসল একজন মানুষ। আমি বই পড়তে অনেক ভালোবাসি, তবে আমার ছোট মামা কবি, সাংবাদিক, আইনজীবী নোমান সালমানের প্রতিষ্ঠিত সেইভ দি পুওর পিপল নামের একটা সেচ্ছাসেবী সংস্থায় ২০০২ খ্রিস্টাব্দ থেকে আমাদের এলাকার উন্নয়নের কথা চিন্তা করে ও মানুষের ভোগান্তি কমানোর চেষ্টা করি। সমাজকর্মে স্নাতকোত্তর শেষে বর্তমানে শিক্ষকতা পেশায় কর্মরত। ২০০৬ সনে পেশাগত জীবন শুরু করি দৈনিক ভোরের কাগজ পত্রিকায় কাজ করার মধ্য দিয়ে। এছাড়া দৈনিক ডেসটিনি, দৈনিক বর্তমান, দৈনিক পরিবর্তন, সত্যসংবাদ, বাংলার বনে, কলমের কন্ঠ, আজকের ভোলা, সময়ের চিত্র, অন্যস্বর, দ্বীপকথা, মহাকাল টোয়েন্টিফোর ডটকম, চরফ্যাসন নিউজ টোয়েন্টিফোর ডটকম ও ফোকাস বাংলা টোয়েন্টিফোর ডটকমে কাজ করেছি। বর্তমানে আমি শশীভূষণ বাজার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক পদে কর্মরত আছি। অবসরে ছড়া, গল্প, কবিতা, ফিচার লিখছি। এছাড়া আমি চরফ্যাসন প্রেসক্লাবের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, সাংবাদিক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক, রিপোর্টার্স ইউনিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছি।

স্বপ্ন দেখতে ভালোবাসি, তাই মনে হয় স্বপ্নের কোন সীমারেখা থাকা ঠিক না। আমার মতে একজন মানুষ হয় তার স্বপ্নের সমান বড়। আর দশজনের মতই দোষে-গুণে ভরপুর নিতান্ত সাধারণ একজন মানুষ আমি। আনন্দে হাঁসি আর কষ্ট পেলে কাঁদি। মুক্ত মানুষ হিসেবে আমার স্বাধীনতাটুকু পুরোদমে উপভোগ করতে চাই জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত।

জীবনের পট পরিবর্তনে মানুষ চিরকালই পুরাতনকে পেছনে ফেলে নতুন পথের যাত্রী। কিন্তু ফেলে আসা অতীতের অনেক ঘটনা স্মৃতির পাতায় থেকে যায়। আজীবন জ্বলজ্বল করে জ্বলে। সে স্মৃতিময় ঘটনা কখনও আনন্দের আবার কখনও বেদনার।
আমার কলেজের শেষ দিনটি আমার মনে বেদনাময় স্মৃতি হয়ে আছে। এ বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।…. এইতো আমার আংশিক জীবনের ফেলে আসা কলেজের দিনগুলো ।

লেখক : নেসার নয়ন
+88 017 11 84 35 08