চরফ্যাসনে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে কৃষি জমি

প্রকাশিত: ১০:৪০ অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০২২ | আপডেট: ১০:৪০:অপরাহ্ণ, মে ২১, ২০২২
চরফ্যাসনে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে কৃষি জমি
অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণের কারনে ভোলার চরফ্যাসনে আশঙ্কাজনক হারে কমে যাচ্ছে কৃষি জমি। ফসলি জমি ভরাট করে বসতঘরসহ বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠছে। এসব ফসলি জমির পরিমাণ কমে যাওয়ায় উদ্বেগজনকভাবে ফসলের উৎপাদনও কমে যাচ্ছে। তবে মেঘনার নদীর ক্রমাগত ভাঙনে কমে যাচ্ছে এসব কৃষিজমি। এমনটাই দাবি করছেন স্থানান্তরিত বাসিন্দারা।
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, ফসলি জমির আশেপাশে বাড়িঘর ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, ইটভাটা এসবের কারনে জমির পরিমাণ ও ফসলের চাষাবাদ কমে যাচ্ছে। তবে অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি ভরাট হওয়ায় উপজেলায় আউশ, আমন, ইরি, বোরো ও রবিশস্য উৎপাদন হ্রাস পাচ্ছে।

চরফ্যাসন উপজেলা কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চরফ্যাসন উপজেলায় উপজেলায় ৮৫ হাজার ১৯২ হেক্টর আবাদি জমি ও ৩ হাজার ৩৩৭ হেক্টর অনাবাদি জমি রয়েছে। প্রতিবছর এসব জমির মধ্যে শতকরা ১ শতাংশ কৃষিজমি অপরিকল্পিত বাড়িঘর নির্মাণের কারনে কমে যায়। আবাদি জমির মধ্যে চলতি মৌসুমে ২৭ হাজার ৮ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষ হয়েছে। এছাড়া সবজিসহ অন্যান্য মৌসুমি ফসল চাষ হয়েছে ৭৫ হাজার ৭২ হেক্টর জমিতে।

মেঘনা নদীরপাড়ের বসত পাল্টানো বাসিন্দা বশির চকিদার (৬৫)। পাঁচবারের ভাঙনে সবকিছু হারিয়ে নতুন বাড়ি করেছেন উপজেলার জিন্নাগর ইউনিয়নের কাশেমগঞ্জ এলাকায়। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাক্ষী হয়েছেন অনেক দৃশ্যপটের। মেঘনা নদী ভাঙনের শত স্মৃতির বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘খড়-কুটোর ঘর, গবাদি পশু, চাষের জমি, এমনকি পরিবার ও জীবনসহ সবকিছুই বিপদের মুখে রেখে বসবাস করতে হয় নদীর তীরের মানুষদের। ঝড়-বন্যা আর ভাঙন আমাদের নিত্যসঙ্গী। এমনিতেই গরিব, তার ওপর আবার বসতভিটা, চাষের জমি, থাকার ঘরও খোয়া গেছে ভাঙনে। তাই ভাঙনে ধরা গ্রামের মানুষগুলোর বারবার বসত পাল্টাতে হয়। এজন্য এখানে ৮ শতাংশ জমি কিনে বাড়ি করেছি।’

একই এলাকার শাহেআলম মাঝি। বয়স ৫৭ ছুঁয়েছে। ৬ জনের সংসার চালাতে হয় অন্যের নৌকায় মাছ ধরে। বেশ বড় বাড়ি ছিল এক সময়। এক সময় নিজের কৃষি জমি আবাদ করেই সংসার চলতো। নদী ভাঙনে সব হারিয়ে এখন ৪ শতাংশ জমিতে টিন দিয়ে চারচালা ঘর করেছেন।

দক্ষিণ আইচা অধ্যক্ষ নজরুল ইসলাম কলেজের অধ্যক্ষ আবুল হাসেম মহাজন বলেন, ‘চরফ্যাসন উপজেলায় মানুষের আয়ের উৎসের সিংহভাগ হলো কৃষি। ফসল উৎপাদন কমে যাবার অন্যতম কারণ হচ্ছে কৃষিজমির পরিমাণ ক্রমশ কমে যাওয়া। কয়েক বছর আগেও কৃষিজমির পরিমাণ যা ছিল আবাসিক চাহিদা ও নদী ভাঙ্গনে অনেকটা কমে গেছে। অপরিকল্পিত বসতবাড়ি, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, ইটভাটা, পুকুর খননসহ নানা রকম স্থাপনা যত্রতত্র গড়ে উঠছে। এতে ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে। ফলে কয়েক বৎসর পর কৃষি উৎপাদন মারাত্মকহারে হ্রাস পাবে। তাই আমি মনেকরি জমির যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে সবার আগে জাতীয় ভূমি ব্যবহার পরিকল্পনা ও নীতিমালা জরুরী।’

চরফ্যাসন উপজেলার উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা ঠাকুর কৃষ্ণ বলেন, বর্তমানে একই আবাদি জমিতে বহুমুখী শস্যের চাষ হওয়ায় চরফ্যাশন উপজেলায় খাদ্যে ঘাটতি নেই। তবে যেভাবে আবাদি জমির সংখ্যা কমে যাচ্ছে, তাতে একসময় খাদ্য ঘাটতি দেখা দিতে পারে। এ উপজেলার ২ লক্ষ ৬০ হাজার কৃষক রয়েছে। অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি ভরাট হয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা তাদের পেশা বদলে ফেলছে। আসলে কৃষিজমি সুরক্ষা আইন যথাযথভাবে কার্যকর না হওয়ার কারনে অপরিকল্পিতভাবে কৃষিজমি ভরাট ও স্থাপনা রোধ সম্ভব হচ্ছে না। তবে এসব বিষয়ে জনসচেতনতার প্রয়োজন।’

উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা আল নোমান বলেন, ‘কৃষিজমি রক্ষা এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কৃষিজমি (যথাযথ ব্যবহার ও সংরক্ষণ) আইন-২০২২, কার্যকর হলে কেউ কৃষি জমি অকৃষি কাজে ব্যবহার করলে অর্থদণ্ড ও কারাদণ্ডে দণ্ডিত হবেন।’