মেটাভার্স আসলে কী এবং তা কীভাবে কাজ করবে?

প্রকাশিত: ১০:৪৬ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২১ | আপডেট: ১০:৪৬:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ২৯, ২০২১
মেটাভার্স আসলে কী এবং তা কীভাবে কাজ করবে?

শিগগিরই মেটাভার্সের মাধ্যমে গোটা দুনিয়া চলবে। তাই সেই দুনিয়ায় নিজের শক্তিশালী আবস্থান তৈরি করতে এখনই কোম্পানির নাম বদল করে মেটা রেখেছে ফেসবুক। এর আগে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি কোম্পানি অকুলাসও কিনে নিয়েছে ফেসবুক।

‘মেটাভার্স’ শব্দটি প্রযুক্তি শিল্পের কল্পনার জগতে সর্বশেষ আলোড়ন তোলা একটি শব্দ। মেটাভার্সের ধারণা এতটাই আলোড়ন তুলেছে যে, সবচেয়ে বিখ্যাত ইন্টারনেট প্ল্যাটফর্মগুলো একে আলিঙ্গন করার জন্য নিজেদের রিব্র্যান্ডিং করছে।

সেই ধারাবাহিকতায় ফেসবুক-এর সিইও মার্ক জাকারবার্গ বৃহস্পতিবার ঘোষণা দেন যে, তিনি তার কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে মেটা প্ল্যাটফর্মস ইনকর্পোরেটেড, বা সংক্ষেপে মেটা করছেন।

সায়েন্স ফিকশন লেখক নীল স্টিফেনসন তার ১৯৯২ সালের উপন্যাস ‘স্নো ক্র্যাশ’-এ সর্বপ্রথম এই শব্দটি ব্যবহার  করেছিলেন। এরপর মেটাভার্সের ধারণা নিয়ে সবচেয়ে বড় ব্যাপার হতে যাচ্ছে ফেসবুকের এই নাম বদল। তবে ফেসবুক ছাড়াও আরও অনেক কোম্পানিও মেটাভার্স তৈরি করার চিন্তা করছে।

মেটাভার্স আসলে কী?

একে আপনি ইন্টারনেটকে জীবন্ত করে তোলা বা অন্ততপক্ষে থ্রিডিতে রুপান্তর করা হিসেবে ভাবতে পারেন। জাকারবার্গ এটিকে একটি ‘ভার্চুয়াল পরিবেশ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন, যেখানে আপনি শুধু স্ক্রিনে দেখার পরিবর্তে এর ভেতরেও ঢুকে যেতে পারবেন। মূলত এটি এক অন্তহীন আন্তঃসংযুক্ত ভার্চুয়াল কমিউনিটির একটি বিশ্ব যেখানে লোকে ভার্চুয়াল রিয়েলিটি হেডসেট, অগমেন্টেড রিয়েলিটি চশমা, স্মার্টফোন অ্যাপ বা অন্যান্য ডিভাইস ব্যবহার করে দেখা করতে, নানা কাজ করতে এবং খেলতে পারবে।

নতুন প্রযুক্তি বিশ্লেষক ভিক্টোরিয়া পেট্রোকের মতে, এতে অনলাইন জীবনের অন্যান্য দিক, যেমন শপিং এবং সোশ্যাল মিডিয়াও থাকবে।

ভিক্টোরিয়া পেট্রোক বলেন, ‘এটি যোগাযোগ প্রযুক্তির বিবর্তনের পরবর্তী ধাপ, যেখানে সমস্ত জিনিস একটি বিরামহীন, ডপেলগ্যাঞ্জার মহাবিশ্বে একত্রিত হব এবং আপনি আপনার শারীরিক জীবন যাপনের মতোই ভার্চুয়াল জীবন যাপন করবেন’।

এমন এক বিশ্বের কথা ভেবে দেখুন যেখানে একটি কোম্পানি তাদের নতুন মডেলের একটি গাড়ি তৈরি করার পর সেটা অনলাইনে বাজারে ছেড়ে দিল এবং একজন ক্রেতা হিসেবে আপনি বিশ্বের যেকোনো স্থান থেকে গাড়িটি চালিয়ে দেখতে পারলেন।

অথবা ঘরে বসে অনলাইন শপিং করার সময় একটি পোশাক পছন্দ হলো। ওই পোশাকের একটি ডিজিটাল সংস্করণ গায়ে দিয়ে দেখার পরই আপনি জামাটি কেনার জন্য অর্ডার দিলেন।

বিষয়টা হয়তো বৈজ্ঞানিক কল্প-কাহিনীর ওপর ভিত্তি করে নির্মিত সাই-ফাই মুভির মতো মনে হচ্ছে। কিন্তু সত্যি কথা বলতে এখন আর সেটা কল্পনার পর্যায়ে থাকছে না। এরকম এক প্রযুক্তি তৈরির কাজ ইতোমধ্যে শুরু করে হয়ে গেছে।

এই প্রযুক্তির ফলে অনলাইনের ভার্চুয়াল জগতকে মনে হবে সত্যিকারের বাস্তব পৃথিবীর মতো।

ধরা যাক ফেসবুকে আপনার একজন বন্ধু পার্বত্য চট্টগ্রামের পাহাড়ে বেড়াতে যাওয়ার অপূর্ব কিছু ছবি পোস্ট করেছেন। ফেসবুক দেখার সময় এই প্রযুক্তির কারণে মনে হবে আপনিও সেখানে উপস্থিত আছেন।

আর যে প্রযুক্তির মাধ্যমে এসব ঘটবে তার নাম মেটাভার্স। আর বলা হচ্ছে, মেটাভার্সই হবে ইন্টারনেটের ভবিষ্যৎ।

প্রযুক্তিবিদরা বলছেন, মেটাভার্সের কারণে ইন্টারনেটের ভার্চুয়াল জগতকে মনে হবে বাস্তব জগতের মতো যেখানে মানুষের যোগাযোগ হবে বহুমাত্রিক। মেটাভার্স প্রযুক্তির মাধ্যমে আপনি কোন কিছু শুধু দেখতেই পাবেন না, তাতে নিজেকে জড়িয়ে ফেলতেও সক্ষম হবেন।

মেটাভার্সে আমরা কী করতে পারব?

ভার্চুয়াল কনসার্টে যাওয়া, অনলাইনে বেড়াতে যাওয়া, আর্টওয়ার্ক দেখা বা তৈরি করা এবং ডিজিটাল পোশাক কেনা বা কেনার মতো জিনিস করতে পারবো আমরা।

মেটাভার্স করোনাভাইরাস মহামারীর ফলে বাড়ি থেকেই অফিস করার যে পদ্ধতি শুরু হয়েছে সে ক্ষেত্রেও একটি গেম-চেঞ্জার হতে পারে। এর ফলে ভিডিও কল গ্রিডে সহকর্মীদের দেখার পরিবর্তে, একটি ভার্চুয়াল অফিসে আপনি তাদের সঙ্গে যোগ দিতে পারবেন।

ফেসবুক তার ওকুলাস ভিআর হেডসেটগুলোর সঙ্গে ব্যবহার করার জন্য হরাইজন ওয়ার্করুম নামক মিটিং সফ্টওয়্যার চালু করেছে। তবে এই হেডসেটের দাম ৩০০ ডলার বা তার বেশি। ফলে মেটাভার্সের সবচেয়ে অত্যাধুনিক অভিজ্ঞতা অনেকেরই নাগালের বাইরে রয়ে যাবে।

যারা এই হেডসেট কিনতে পারবে তারা তাদের অবতারের মাধ্যমে বিভিন্ন কোম্পানির তৈরি ভার্চুয়াল জগতে উড়ে বেড়াতে পারবে।

প্রযুক্তি কোম্পানিগুলোকে এজন্য তাদের অনলাইন প্ল্যাটফর্মগুলোকে একে অপরের সঙ্গে কীভাবে সংযুক্ত করা যায় তা খুঁজে বের করতে হবে। একে কার্যকর করার জন্য প্রতিযোগী প্রযুক্তির প্ল্যাটফর্মগুলোকে কিছু মানদণ্ড তৈরি করে তাতে একমত হতে হবে, যাতে ‘ফেসবুক মেটাভার্স’ এবং ‘মাইক্রোসফ্ট মেটাভার্সে’ আলাদা আলাদা লোকরা না থাকে, বরং সব মেটাভার্সে সবাই প্রবেশ করতে পারে।

ফেসবুক কি তাহলে ভবিষ্যতে মেটাভার্সকেই বেশি গুরুত্ব দিতে যাচ্ছে?

জাকারবার্গ ইন্টারনেটের পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে যা দেখেন তাতেই বেশি বিনিয়োগ করবেন। কারণ তিনি মনে করেন যে, এটি ডিজিটাল অর্থনীতির একটি বড় অংশ হতে চলেছে।

বিগত কয়েক বছর ধরেই ভার্চুয়াল রিয়েলিটি ও অগমেন্টেড রিয়েলিটি নিয়ে গবেষণার কাজ করছিল ফেসবুক। সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানি থেকে নিজের পরিচয় পরিবর্তন করতেই নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে ফেসবুক। মূলত সোশ্যাল মিডিয়া কোম্পানির পরিচয় থেকে বেরিয়ে আসতে চাইছে ফেসবুক।

জাকারবার্গ বলেন, ‘আমরা ইন্টারনেটের পরবর্তী অধ্যায়ের শুরুতে আছি, এবং এটি আমাদের কোম্পানির জন্যও পরবর্তী অধ্যায়।

সাম্প্রতিক দশকগুলোতে, প্রযুক্তি মানুষকে আরও স্বাভাবিকভাবে যোগাযোগ করার এবং নিজেদের প্রকাশ করার শক্তি দিয়েছে। আমি যখন ফেসবুক শুরু করি, তখন আমরা শুধু ওয়েবসাইটে টেক্সট টাইপ করতাম। আমরা যখন ক্যামেরা সহ ফোন পেয়েছি, তখন ইন্টারনেট আরও ভিজ্যুয়াল এবং মোবাইল হয়ে উঠেছে। ইন্টারনেটের গতি বাড়ার ফলে অভিজ্ঞতা শেয়ার করার একটি সমৃদ্ধ উপায় হয়ে উঠেছে ভিডিও। আমরা ডেস্কটপ থেকে ওয়েবে, ওয়েব থেকে মোবাইলে চলে এসেছি; টেক্সট থেকে ছবিতে এবং ছবি থেকে ভিডিও পর্যন্ত এসেছি। কিন্তু এখানেই শেষ নয়।

পরবর্তী প্ল্যাটফর্মটি আরও বেশি গভীর হবে, যা হবে এক জীবন্ত ইন্টারনেট, যেখানে আপনি শুধু এর দিকে তাকাবেনই না বরং অভিজ্ঞতার মধ্যে থাকবেন। আমরা এর নাম দিয়েছি মেটাভার্স, এবং এটি আমাদের তৈরি প্রতিটি পণ্যকে স্পর্শ করবে।

মেটাভার্সের মূল বৈশিষ্ট্য হবে উপস্থিতির অনুভূতি- যেন আপনি বাস্তবেই অন্য ব্যক্তির সঙ্গে বা অন্য জায়গায় হাজির আছেন। অন্য ব্যক্তির সঙ্গে সত্যিকারের উপস্থিতির বোধই সামাজিক প্রযুক্তির চূড়ান্ত স্বপ্ন। এ কারণেই আমরা এটি নির্মাণের দিকে মনোনিবেশ করছি।

মেটাভার্সে আপনি কল্পনা করতে পারেন এমন প্রায় সব কিছু করতে পারবেন- বন্ধু এবং পরিবারের সঙ্গে একত্র হওয়া, কাজ করা, শেখা, খেলা, কেনাকাটা করা, সৃষ্টি করা- সেইসঙ্গে সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা যা সত্যিই আজ আমরা কম্পিউটার বা ফোন সম্পর্কে যেভাবে চিন্তা করি তার সঙ্গে খাপ খায় না। আমরা একটি ফিল্ম বানিয়েছি যাতে দেখানো হয়েছে কিভাবে আপনি একদিন মেটাভার্স ব্যবহার করতে পারবেন।

এই ভবিষ্যতে, আপনি রাস্তা দিয়ে যাতায়াত ছাড়াই অফিসে, বন্ধুদের সঙ্গে কনসার্টে বা আপনার বাবা-মায়ের বসার ঘরে হলোগ্রাম হিসাবে তাৎক্ষণিকভাবে টেলিপোর্ট বা হাজির হতে সক্ষম হবেন। আপনি যেখানেই বাস করেন না কেন এটি আরও সুযোগ উন্মুক্ত করবে। আপনি আপনার জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোতে আরও বেশি সময় ব্যয় করতে, ট্র্যাফিকের সময় কমাতে এবং আপনার কার্বন নিঃসরণ কমাতে সক্ষম হবেন।

এখন থেকে আমরা মেটাভার্স-ফার্স্ট হব, ফেসবুক-ফার্স্ট নয়, অর্থাৎ মেটাভার্সই আমাদের প্রধান কাজ হবে। এর মানে হল যে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমাদের অন্যান্য পরিষেবাগুলো ব্যবহার করার জন্য আপনার কোনো ফেসবুক অ্যাকাউন্টের আর প্রয়োজন হবে না।

মেটাভার্স কি শুধু একটি ফেসবুক প্রকল্প?

না। মেটাভার্স নিয়ে কাজ করা অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে রয়েছে মাইক্রোসফট এবং চিপমেকার এনভিডিয়া।

এনভিডিয়ার ওমনিভার্স প্ল্যাটফর্মের ভাইস প্রেসিডেন্ট রিচার্ড কেরিস বলেছেন, ‘আমরা মনে করি মেটাভার্সে ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড এবং পরিবেশ তৈরি করার জন্য প্রচুর কোম্পানি হতে চলেছে, ঠিক যেভাবে ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েবে অনেক কোম্পানি কাজ করছে। উন্মুক্ত এবং প্রসারণযোগ্য হওয়া গুরুত্বপূর্ণ, যাতে আপনি বিভিন্ন জগতে টেলিপোর্ট করতে পারেন, তা একটি কোম্পানি বা অন্য কোম্পানির মাধ্যমেই হোক, যেভাবে আমরা এক ওয়েব পেজ থেকে অন্য ওয়েব পেজে যাই’।

ভিডিও গেম কোম্পানিগুলোও এতে অগ্রণী ভূমিকা নিচ্ছে। জনপ্রিয় ফোর্টনাইট ভিডিও গেমের পেছনের সংস্থা এপিক গেমস মেটাভার্স তৈরির উদ্দেশ্যে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনায় সহায়তা করার জন্য বিনিয়োগকারীদের কাছ থেকে ১ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে। গেম প্ল্যাটফর্ম রোব্লক্স আরেকটি বড় সংস্থা, যারা মেটাভার্সকে কল্পনা করেছে এমন একটি জায়গা হিসেবে যেখানে ‘লোকে শিখতে, কাজ করতে, খেলতে, সৃষ্টি করতে এবং সামাজিক যোগাযোগের লক্ষ লক্ষ থ্রিডি অভিজ্ঞতার মধ্যে একত্রিত হতে পারবে’।

ভোক্তা ব্র্যান্ডগুলিও এই প্রবণতায় তাল মেলানোর চেষ্টা করছে। ইতালীয় ফ্যাশন হাউস গুচি শুধুমাত্র ডিজিটাল যন্ত্রপাতি বিক্রি করার জন্য রোব্লক্স এর সঙ্গে সহযোগিতা করেছে। কোকা-কোলা এবং ক্লিনিক ডিজিটাল টোকেন বিক্রি করেছে মেটাভার্সের দিকে একটি প্রথম পদক্ষেপ হিসেবে।