মার্কিন ধনকুবের রবার্ট ডার্স্টের আজীবন কারাদণ্ড

প্রকাশিত: ৬:৩৩ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২১ | আপডেট: ৬:৩৩:অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৫, ২০২১
মার্কিন ধনকুবের রবার্ট ডার্স্টের আজীবন কারাদণ্ড

বান্ধবীকে হত্যার দায়ে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ আবাসন ব্যবসায়ী পরিবারের সদস্য রবার্ট ডার্স্টকে আজীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। তার প্যারোলে মুক্তি পাওয়ার কোনো সম্ভাবনাও রাখা হয়নি।

পারিবারিক ব্যবসার উত্তরাধিকার সূত্রে ধনী এবং শতকোটিপতি হওয়া ডার্স্ট ‘দ্য জিংক্স’ শিরোনামে এইচবিওর একটি বিস্ফোরক ডকুমেন্টারির বিষয় ছিলেন। তিনি তার বন্ধু সুসান বারম্যানকে ২০০০ সালে তার বেভারলি হিলসের বাড়িতে মাথার পেছনে গুলি করে হত্যা করেছিলেন। তবে তিনি সবসময় সেই অভিযোগ অস্বীকার করে এসেছেন।

ডার্স্ট তার স্ত্রীর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে পুলিশের সাথে কথা বলা বন্ধ করতেই মিসেস বারম্যানকে (৫৫) হত্যা করেন। লস অ্যাঞ্জেলেসের নিজ বাড়িতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন সুসান বারম্যান। তিনি ডার্স্টের ঘনিষ্ঠ বান্ধবী হিসেবে পরিচিত ছিলেন।

ডার্স্টের স্ত্রী ক্যাথলিন এই হত্যাকাণ্ডের বেশ কিছু সময় আগে থেকেই নিখোঁজ ছিলেন। পুলিশের কাছে নিখোঁজ স্ত্রীর বিষয়ে সুসান তথ্য দিতে পারেন- এমন আশঙ্কা ছিল ডার্স্টের। তাই তিনি সুসানকে গুলি করে হত্যা করেছিলেন বলে আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।

গত মাসে লস এঞ্জেলেসের একটি জুরি বোর্ড বারম্যানের হত্যার জন্য ৭৮ বছর বয়সী ডার্স্টকে দোষী সাব্যস্ত করতে মাত্র আট ঘন্টা সময় নিয়েছিল।

যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের রায় পড়ার আগে বিচারক মার্ক উইন্ডহ্যাম বলেন, ‘এই অপরাধ ছিল সাক্ষী হত্যার। পরিস্থিতি … এই ভয়ঙ্কর, বিরক্তিকর অপরাধকে প্রচণ্ডভাবে বড় করে তুলেছে’।

উইন্ডহ্যাম এই মামলায় নতুন করে বিচারের জন্য আসামীর উকিলের অনুরোধ প্রত্যাখ্যান করে বলেন, ‘আসলে, অপরাধের যথেষ্ট প্রমাণ রয়েছে’।

আদালত মিসেস বারম্যানের ছেলে সারেব কাউফম্যানের কথাও শুনেছেন, যিনি বলেন যে, ডার্স্ট তার মাকে হত্যা না করলে তার জীবন কেমন হতো তা নিয়ে তিনি বিস্মিত।

কান্নাকাটি করে কফম্যান বলেন, ‘প্রতিটি পরিকল্পনা সম্পূর্ণভাবে ভেসে গেছে। তুমি আমাকেও হত্যা করেছ, আমি যে ব্যক্তি ছিলাম’।

বৃহস্পতিবার আদালতের অধিবেশনে ডার্স্ট হুইল চেয়ারে বসে ছিলেন।

প্রসিকিউটররা বলছেন, তিনি তার স্ত্রী ক্যাথলিনের নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় নিউইয়র্ক পুলিশের তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা থেকে বিরত রাখতে তার বান্ধবী অপরাধ লেখক সুসান বারম্যানকে হত্যা করেছিলেন।

লাস ভেগাসের এক গ্যাংস্টারের মেয়ে সুসান বারম্যান স্ত্রী নিখোঁজের সন্দেহভাজন হওয়ার পর ডার্স্টের মুখপাত্র হিসেবে কাজ করেছিলেন।

১৯৮২ সালে নিখোঁজ হওয়া ডার্স্টের স্ত্রী ক্যাথলিনের সন্ধান এখনো মেলেনি। পুলিশ তাঁকে মৃত হিসেবেই ধরে নিয়েছে। ক্যাথলিন একজন মেডিকেলের ছাত্রী ছিলেন। তার স্বপ্ন ছিল একজন ভালো ডাক্তার হওয়া। স্ত্রী নিখোঁজ হওয়ার ঘটনায় আগে থেকেই সন্দেহের তালিকায় ছিলেন ডার্স্ট। তবে হাতে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ না থাকায় তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ গঠন করেনি পুলিশ।

এ নিয়ে ডার্স্ট প্রথমে পুলিশের ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকলেও পরে নাটকীয়ভাবে ঘটনা ভিন্ন দিকে মোড় নেয়। সে সময় টেলিভিশন চ্যানেল এইচবিওতে ডার্স্টের জীবনী নিয়ে একটি ডকুমেন্টারি নির্মাণ করা হচ্ছিল। তাতেই ডার্স্টের গোপন কথোপকথন প্রকাশিত হয়। গোপন মাইক্রোফোনে তাঁর অপরাধের স্বীকারোক্তি শোনা যায়। ওই বক্তব্য গোপনে রেকর্ড করেছিল এইচবিও।

২০১৫ সালের মার্চে এসে ডার্স্টের জীবনী নিয়ে ওই ডকুমেন্টারির শেষ পর্ব প্রচার করা হয়। সেখানে সম্প্রচার করা হয় তাঁর অজান্তে রেকর্ড হয়ে যাওয়া ওই কথাগুলো। এর ঠিক আগমুহূর্তে মার্কিন এই ধনকুবেরকে যুক্তরাষ্ট্রের নিউ অরলিন্স শহরের একটি হোটেল থেকে গ্রেপ্তার করা হয়।

এদিকে শুধু ক্যাথলিনের নিখোঁজ কিংবা সুসানের হত্যাকাণ্ডই নয়, এইচবিওর ডকুমেন্টারিতে মরিস ব্ল্যাক নামের এক ব্যক্তির মৃত্যুর সঙ্গেও ডার্স্টের সংশ্লিষ্টতা উঠে আসে। মরিস যুক্তরাষ্ট্রের টেক্সাস অঙ্গরাজ্যে ডার্স্টের প্রতিবেশী ছিলেন। তাঁকে হত্যার বিষয়টি স্বীকার করেছেন ডার্স্ট।

আদালতকে তিনি জানান, আত্মরক্ষা করতেই সে সময় তিনি তাকে হত্যা করেছিলেন। ওই মামলায় পরে অবশ্য তাঁকে নিরপরাধ ঘোষণা করা হয়েছিল। ডার্স্ট সেসময় টেক্সাসে আত্মগোপনে গিয়েছিলেন। আর মরিস তার পরিচয় আবিষ্কার করে ফেলেছিল। যে কারণে মরিসকে হত্যা করেন ডার্স্ট।

স্ত্রীর মৃত্যুর জন্যও তাঁকে কখনো দায়ী করা হয়নি। ২০ বছর কেটে গেল শুধু সুসানের হত্যাকাণ্ড নিয়েই।

দ্য জিংক্স এর শেষ পর্বে, ডার্স্টকে বিড়বিড় করে বলতে শোনা গেছে, ‘আমি কী করেছি? অবশ্যই তাদের সবাইকে হত্যা করেছি’।

দ্য জিংক্স এর শেষ পর্ব প্রচারিত হওয়ার কয়েক ঘন্টা আগে, মিসেস বারম্যানের হত্যার জন্য কর্তৃপক্ষ নিউ অরলিন্স থেকে ডার্স্টকে গ্রেফতার করে।

প্রসিকিউটররা ৭৮ বছর বয়সী ডার্স্টকে ‘নার্সিসিস্টিক সাইকোপ্যাথ’ বা ‘আত্মমুগ্ধ সাইকোপ্যাথ’ বলে আখ্যা দিয়েছিলেন। অথচ এবার তাকে বাকী জীবন কারাগারে থেকেই তারপর মরতে হবে।

২০১০ সালে তার বিয়ে নিয়ে ‘অল দ্য গুড থিংস’ নামের একটি সিনেমা বানানো হয়। এতে অভিনয় করেছিলেন রায়ান গোসলিং এবং কার্স্টেন ডানস্ট।

‘দ্য জিংক্স’ এর নির্মাতা অ্যান্ড্রু জেরেকি এই সিনেমারও ডিরেক্টর হিসেবে কাজ করেন। ছবিটিতে এই ধনকুবেরের জীবন চিত্রিত করা হয়েছে, যেখানে তাকে একজন খুনি হিসাবে দেখানো হয়েছিল।

ডার্স্ট নিউইয়র্কের সবচেয়ে ধনী এবং সবচেয়ে ক্ষমতাশালী রিয়েল এস্টেট পরিবারের একজন বিচ্ছিন্ন সদস্য।