আফগানিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান ‘গুপ্তধনের’ খোঁজে তালেবান

প্রকাশিত: ৭:১৫ অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১ | আপডেট: ৭:১৫:অপরাহ্ণ, সেপ্টেম্বর ২৪, ২০২১
আফগানিস্তানের সবচেয়ে মূল্যবান ‘গুপ্তধনের’ খোঁজে তালেবান

তালেবানরা আফগানিস্তানের ক্ষমতা দখলের পর দেশটির প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের ভবিষ্যত অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। যদিও তারা কোনো প্রত্নসম্পদ লুট বা ইচ্ছাকৃতভাবে ধ্বংস না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।

তবে কিছু সংবাদ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে যে, তালেবানরা ইতিমধ্যেই দেশের অন্যতম বিখ্যাত গুপ্তধন তথাকথিত ‘ব্যাকট্রিয়ান ট্রেজার’ খুঁজছে। ২০ হাজারেরও বেশি শিল্পকর্মের এই প্রত্নতাত্ত্বিক সংগ্রহের অনেকগুলোই সোনা দিয়ে তৈরি। ১৯৭৮ সালে টিলিয়া টেপ নামের এক জায়গায় ২ হাজার বছরের পুরনো একটি কবরে পাওয়া গিয়েছিল এই প্রত্নসম্পদ। উদ্ধারের পর এই গুপ্তধন আফগান জাতীয় জাদুঘরে রাখা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রপতি ভবনে প্রদর্শিত হয়েছিল। কিন্তু বর্তমান এর অবস্থান অজানা।

তালেবানদের হুমকির সম্মুখীন হতে পারে এমন অন্যান্য প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদের মধ্যে রয়েছে মেস আয়নাক নামের একটি বৌদ্ধ শহর, যা প্রায় ১৬০০ বছর আগে সমৃদ্ধি অর্জন করেছিল। শহরটি কিংবদন্তির সিল্ক রোডের পাশে অবস্থিত ছিল এবং এটি বাণিজ্য এবং পূজা উভয় ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হত। অসংখ্য প্রাচীন বৌদ্ধ বিহার এবং অন্যান্য প্রাচীন বৌদ্ধ নিদর্শন সেখানকার মাটির নিচে লুকিয়ে আছে।

তালেবানরা তাদের ১৯৯৬-২০০১ সালের শাসনামলে এই বৌদ্ধ প্রত্নসম্পদের অনেকগুলো ধ্বংস করেছিল, যার মধ্যে ষষ্ঠ শতাব্দীর দুটি বিশাল মূর্তি ছিল যা ‘বামিয়ানের বুদ্ধ’ নামে পরিচিত, যা সেখানকার একটি পাহাড়চূড়ায় খোদাই করা হয়েছিল। মূর্তিগুলো নামানোর জন্য তালেবানরা রকেট, ট্যাঙ্ক-নিক্ষেপিত প্রজেক্টাইল এবং ডিনামাইট ব্যবহার করেছিল।

মেস আয়নাকের ভবিষ্যতও বিশেষভাবে অন্ধকার বলেই মনে হচ্ছে। কারণ সেখানকার খনন ও সংরক্ষণের জন্য ব্যবহৃত সমস্ত সরঞ্জাম হাওয়া হয়ে গেছে। এবং তালেবানরা অজানা উদ্দেশ্যে সেই স্থান পরিদর্শন করেছে।

মেস আয়নাকের খননকার্যের নেতৃত্বদানকারী প্রত্নতত্ত্ববিদ খায়ের মুহাম্মদ খায়রজাদা বলেন, ‘সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের পরিস্থিতি ঠিক নেই, কারণ এই মুহূর্তে কেউই প্রত্নতাত্মিক স্থান এবং স্মৃতিসৌধের যত্ন নিচ্ছে না’। খাইরজাদা বলেন, ‘আফগানিস্তানের সমস্ত প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান ঝুঁকিতে রয়েছে। কারণ কোন পর্যবেক্ষণ নেই, চিকিৎসা নেই এবং যত্ন নেই, সমস্ত প্রদেশের সমস্ত বিভাগ বন্ধ আছে, সাইট এবং স্মৃতিস্তম্ভের যত্ন নেওয়ার জন্য অর্থ এবং অন্যান্য সুযোগ-সুবিধাও নেই’। সম্প্রতি, তালেবানদের হাত থেকে বাঁচতে খায়রজাদা ফ্রান্সে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।

খায়রজাদা বলেছিলেন যে, মেস আয়নাকে খনন ও সংরক্ষণের জন্য তারা যে সমস্ত সরঞ্জাম ব্যবহার করেছিলেন সেসব ‘উধাও হয়ে গেছে’।

মেস আয়নাকের পাশেই চীন একটি খনির অধিকার পেয়েছে এবং তালেবানরা ক্ষমতা দখলে নেওয়ার আগেও প্রত্নতাত্ত্বিকরা আশঙ্কা করছিলেন যে, এখানে যদি খনি খনন করা হয় তাহলে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানটির কিছু অংশ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। তালেবানরা কাবুল দখল করার পর তারা ঘোষণা করেছিল যে, তারা চীনের কাছ থেকে অর্থনৈতিক সহায়তা চাইবে, কিন্তু চীন ওই এলাকায় একটি খনি নির্মাণ করতে চায় কিনা তা স্পষ্ট নয়।

আফগানিস্তানে ফরাসি প্রত্নতাত্ত্বিক প্রতিনিধিদলের পরিচালক জুলিও বেন্দেজু-সারমিয়েন্টো বলেন, তিনি জানতে পেরেছেন যে, তালেবানরা মেস আয়নাক পরিদর্শন করেছে, কিন্তু কেন তা জানা যায়নি। বেন্দেজু-সারমিয়েন্টো বলেন, ‘এই সফরের তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য কি তা বলা মুশকিল’। ২০২২ সালে ফ্রান্সে মেস আইনাক এবং আফগানিস্তানের অন্যান্য স্থান থেকে শিল্পকর্মের একটি প্রদর্শনী করার পরিকল্পনা ছিল, কিন্তু জিনিসপত্র ফ্রান্সে নেওয়ার আগেই তালেবানরা কাবুল দখল করে নেয়।

এখন পর্যন্ত তালেবানদের ইচ্ছাকৃতভাবে শিল্পকর্ম ধ্বংস করার কোনো খবর পাওয়া যায়নি, এবং তালেবান নেতৃত্ব বিবৃতি দিয়ে বলেছে যে তারা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ রক্ষা করবে। তবে, তালেবানরা আসলেই তাদের প্রতিশ্রুতি পালন করবে কিনা তা নিয়ে অনেকের সন্দেহ আছে।

আফগান হেরিটেজ ম্যাপিং পার্টনারশিপের নেতৃত্বদানকারী শিকাগো ইউনিভার্সিটির ওরিয়েন্টাল ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক গিল স্টেইন আফগানিস্তানের হাজার হাজার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের পর্যবেক্ষণের জন্য মানচিত্র ও স্যাটেলাইট চিত্র ব্যবহার করছেন। স্টেইনের অনুমান যে তারা এখন পর্যন্ত আফগানিস্তানে প্রায় ২৫ হাজার প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের অবস্থান ম্যাপ করেছেন। আফগানিস্তানে প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ লুটপাট একটি দীর্ঘদিনের সমস্যা, কিন্তু স্টেইন বলেছিলেন যে, এখন পর্যন্ত তিনি এমন কোনো প্রমাণ পাননি যে তালেবানরা এই লুটপাটকে সমর্থন করছে।

সম্প্রতি তালেবানরা কাবুল এবং উত্তর আফগানিস্তানের কিছু অংশ দখল করলেও তারা গত কয়েক বছর ধরেই দক্ষিণ আফগানিস্তানের কিছু অংশের নিয়ন্ত্রণে ছিল। স্টেইন লাইভ সায়েন্সকে বলেন, দক্ষিণের যেসব এলাকায় তালেবানরা বছরের পর বছর ধরে নিয়ন্ত্রণ করছে সেখানে ইরাক এবং সিরিয়ায় ইসলামিক স্টেট গোষ্ঠীর (আইএসআইএস বা আইএসআইএল) নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলের মতো বড় আকারের লুটপাট দেখা যায়নি।

‘মূলত, তালেবানরা লুটপাট করছিল না, যেভাবে আইএসআইএল তাদের আয়ের উৎস হিসেবে লুটপাটকে বেছে নিয়েছিল,’ স্টেইন বলেন। যাইহোক, দলটি দক্ষিণ আফগানিস্তানে অনেক ক্ষেত্রে খুঁজে পেয়েছে যেখানে প্রত্নতাত্ত্বিক স্থানের উপর আফিম উৎপন্ন করার জন্য কৃষি ক্ষেত্র তৈরি করা হয়েছে। স্টেইন বলছিলেন, তালেবানদের ‘লুটপাট করার দরকার ছিল না, কারণ তারা আফিমের ব্যবসা থেকে প্রচুর অর্থ উপার্জন করে আসছিল’।

আফগানিস্তানের উত্তরাঞ্চল, যা সম্প্রতি তালেবানরা দখল করে নিয়েছে, দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় সেখানে অনেক বেশি প্রত্নতাত্ত্বিক স্থান রয়েছে। উত্তর আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক স্যাটেলাইট চিত্রগুলো পরীক্ষা করার পরে স্টেইনের দল ‘যুদ্ধ-সম্পর্কিত ক্ষতি’ দেখেছিল, কিন্তু ব্যাপকভাবে লুটপাটের কোনো নতুন ঘটনা দেখা যায়নি।

তালেবানরা প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন লুট করা বা ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকবে কিনা তা কেবল সময়ই বলে দেবে। তালেবানরা আফগানিস্তানের জাতীয় জাদুঘরের বাইরে রক্ষী মোতায়েন করেছে। ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইরাক আক্রমণের সময় বাগদাদ জাদুঘরের বাইরে কোন প্রহরী ছিল না, যেখানে বিশৃঙ্খলার সময় লুটপাট হয়েছিল।

তবে কাবুলে তালেবান নেতৃত্ব প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন রক্ষার সিদ্ধান্ত নিলেও আফগানিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলের তালেবান গোষ্ঠী সেই আদেশ মেনে চলবে এমন কোন গ্যারান্টি নেই।

গত ২০ বছরে আফগানিস্তান থেকে লুট করা বা চুরি করা কিছু শিল্পকর্ম যুক্তরাষ্ট্রে পাওয়া গিয়েছিল এবং সেগুলো পরে আফগানিস্তানে ফেরতও পাঠানো হয়েছিল। স্টেইন যতদূর জানেন, ফেরত পাঠানো শিল্পকর্মগুলো এখনও আফগানিস্তানের জাতীয় জাদুঘরে রয়েছে।