নদী ছেড়ে দূরে যেতে মন চায় না ওদের!

প্রকাশিত: ৭:৪৫ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২১ | আপডেট: ৭:৫০:অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৫, ২০২১
নদী ছেড়ে দূরে যেতে মন চায় না ওদের!

৭ এপ্রিল বুধবার। উপকূলের মানুষের জীবনযাত্রার তথ্যচিত্রের খোঁজে বের হলাম তেতুলিয়া নদীরপাড়ের উদ্দেশ্যে। সাথে ছিলো স্থানীয় সংবাদকর্মি অকতারুজ্জামান সুজন ও আরিফ হাসান। সন্ধ্যার ঠিক আগমুহূর্তে মোটরসাকেলযোগে রওনা দিলাম আমারা।

বেড়িবাঁধ দিয়ে মোটরসাকেল চালাতে বেগ পেতে হয়েছে অকতারুজ্জামান সুজনের। মোটরসাইকেল থেকে নেমে কোনমতে পায়ে হেটে যেতে হয় গন্তব্যে। কেননা একদিকে কাঁচাবাঁধ অন্যদিকে গর্তে ভরা বেড়িবাঁধটি যানবাহন চলার অনুপোযোগী হলেও মানুষ হাটা দায়। অথচ বেড়িবাঁধের দু’পাশে হাজারো মনুষের বসতি।

সল্পসময়ে আমাদের এই ভোগান্তি পোহাতে হলেও প্রাকৃতিক বৈরিতা, ঝড়-বন্যা আর বিক্ষুব্ধ তরঙ্গের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যুদ্ধ করে বাঁচতে হয়ে এখানকার মনুষের। নদী থেকে ধেয়ে আসা দুর্যোগ-দুর্বিপাকগুলো নিত্যদিনের সঙ্গী। আবার বেঁচে থাকার সব খোড়াক মেলে নদী থেকে। নদীর সঙ্গে ওদের যেমন প্রেম, বেঁচে থাকার লড়াইও সেই নদীর সঙ্গেই। কখনো কখনো ঢেউয়ের বিধ্বংসী রূপ নিয়ে রাক্ষুসী হয়ে ওঠে। বলছিলাম চরফ্যাসন ‍উপজেলার দুলারহাট থানাধীন তেতুলিয়া নদীরপাড়ের মানুষগুলোর জীবনযাত্রার কথা।

স্মৃতি বিজড়িত জন্মস্থান, নিজ হাতে লাগানো ফুল-ফলের গাছ, পোষা প্রাণী, বাবা-দাদা কিংবা স্বজনের কবর পর্যন্ত গ্রাস করে নদী। ভাঙনের ফলে ভেঙে যায় সাজানো ঘর-গৃহস্থলী। এরপর আর ওদের খোঁজ মেলে না। জন্ম থেকে যে নদী হয় বন্ধুত্বের সঙ্গী, সেই নদী ছেড়ে দূরে যেতে মন চায় না ওদের। জন্মভিটের মায়ায় ওরা নদীর কাছে থাকতে চায়।

একজন বশির চকিদার (৬৫)। তেতুলিয়া নদীরপাড়ের বসত পাল্টানো বাসিন্দা। বয়সের সঙ্গে সঙ্গে তিনি সাক্ষী হয়েছেন অনেক দৃশ্যপটের। তেতুলিয়া নদী ভাঙনের শত স্মৃতির বিবরণ দিয়ে তিনি বলেন, ‘খড়-কুটোর ঘর, গবাদি পশু, চাষের জমি, এমনকি পরিবার ও জীবনসহ সবকিছুই বিপদের মুখে রেখে বসবাস করতে হয় নদীর তীরের মানুষদের। কত ঝড়-বন্যা আর ভাঙন আমাদের নিত্যসঙ্গী। ভাঙনে ধরা গ্রামের মানুষগুলোর বারবার বসত পাল্টাতে হয়। এমনিতেই গরিব, তার ওপর আবার বসতভিটা, চাষের জমি, থাকার ঘরও খোয়া যায় ভাঙনে। তাই অভাব কাটে না।

আরেকজন কবির মাঝি (৫৫)। তিনিও বসত পাল্টানো বাসিন্দা। পেশা মাছ ধরা। পাঁচএকর জমির উপর বাড়ি ছিল তার। নদী ভাঙনে এখন সব হারিয়ে সর্বশান্ত। কবির মাঝিকে ৭ জনের সংসার চালাতে নদীতে মাছ ধরতে নামতে হয়েছে অনেক আগেই। অথচ এক সময় নিজের জমিতেই আবাদ করে সংসার চালাতেন। জমি কেনার সামর্থ্য নেই বলে ভাঙনের সঙ্গে মিলেমিশে স্থান বদল করে বসত করছেন তিনি।

একই এলাকার শাহেআলম মাঝি। বয়স ৪০ ছুঁয়েছে। ৬ জনের সংসার চালাতে হয় অন্যের নৌকায় মাছ ধরে। বেশ বড় বাড়ি ছিল এক সময়। এক সময় নিজের জমি আবাদ করেই সংসার চলতো। নদী ভাঙনে সব হারিয়ে এখন পথে বসেছেন। স্থান হয়েছে বেড়িবাঁধে।

গন্তব্য থেকে ফেরার পথে মিনিট পাঁচেক এগুতেই দূর থেকে দেখা গেছে নদীর কূলঘেঁষা একটি নৌকার। স্থানীয় সংবাদকর্মি আরিফ হাসান নৌকার দিকে ক্যামেরা তাক করে কয়েকটি স্থিরচিত্র তোলেন। এসময় ক্যামেরার ফ্রেমেবন্দি হয়ে যায় এক শিশুর নৌকা ধোয়ার দৃশ্য। শিশুটি দিকে এগিয়ে যাই আমরা সবাই। এসময় বেশ কিছুক্ষণ কথা হয় তার সাথে। শিশুটির নাম মিজান (১২)। তেতুলিয়াপাড়ের একটি ঝুপড়ি ঘরের ছয় পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সবচেয়ে ছোট সে। এ গ্রামেই তার জন্মভিটা ছিল। অথচ এখন তা কেবল স্মৃতি। মিজান বলে, ‘আমাদের বাড়ির কাছে প্রাইমেরি স্কুল ছিল, কত বন্ধু ছিল, সবাই বিকালে খেলতাম। কিন্তু ভাঙনে ঘর, স্কুল সব গেছে নদীতে। ছোটবেলা থেকে এমন করে চারবার ভাঙনের মুখে পড়ছি। জমিজমা নেই বলে আর ঘরবাড়ি করা হয়নি। পরে আর লেখাপড়াও করতে ইচ্ছা করে নাই। বাবার সাথে এখন নৌকায় কাজ করি।’

এখানে শিশু মিজানের মত অনেক শিশু রয়েছে। ভাঙন ওদের থেকে শুধু বাসস্থানই কেড়ে নেয় না, শিশুদের জীবন থেকে ভালোবাসার বিদ্যালয়ও হারিয়ে যায়। নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা ছোটবেলার বন্ধুত্বও ভেঙে যায়। এমন করেই গৃহহারা শিশুরা হারিয়ে ফেলে বেড়ে ওঠার পরিবেশ। পরিবারের সেই দুশ্চিন্তার অংশীদার হতে হয় শিশুদেরও। শেষমেষ ঝরে পড়ছে শিক্ষা থেকে। একসময় দক্ষ হয়ে ওঠে নৌকার মাঝি হিসেবে। উপকূলীয় জনপদের লক্ষাধিক পরিবারে প্রতিনিয়ত ভাঙন আতঙ্ক নিত্যসঙ্গী করেই দিন কাটায়।

এমন দুর্বিষহ জীবনে ফের নতুন করে মাথা গোঁজার ঠাঁই খোঁজে অনেকে। সেইসাথে অনেকেই শিকার হয়েছেন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের প্রতারণার। সরকারী ত্রাণের প্রলোভনে হাতিয়ে নিয়েছে শতমানুষের ঘামঝড়া অর্থ। হয়তো এমন শত অনিয়ম চাপা পড়ে গেছে ব্যক্তির কিংবা দলীয় ক্ষমতার অপব্যবহারে।

তবে এমনও অভিযোগ রয়েছে, নদীভাঙনকবলিত এ সমস্ত পরিবারের সদস্যদের নাম জেলেকার্ডের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলে ১৫০০ টাকা করে হাতিয়ে নিয়েছে স্থানীয় কিছু রাজনৈতিক নেতা। তবে এখনো পর্যন্ত ওই সমস্ত পরিবারের লোকজন কোনো ধরনের সাহায্য সহযোগীতা পায়নি। কবে পাবে তাও তাদের জানা নেই।

এখানকার মানুষের জীবনযাত্রা ও অনিয়ম-অভিযোগ এর বিষয়ে কথা হয় নীলকমল ইউনিয়নের ৮নং ওয়ার্ডের সদস্য মো: আলাউদ্দিন মাস্টার এর সাথে। তিনি বলেন, নদীভাঙনরোধে সরকার নতুন যে প্রকল্প গ্রহণ করেছে সেটি ওই এলাকার অন্তর্ভুক্ত। জেলেকার্ডসহ বিভিন্ন ত্রাণ তহবিলের তালিকায় ওই এলাকার নদীভাঙনকবলিত পরিবারের সদস্যদের নাম নতুন করে সংযোজন করা হয়েছে। নতুন বরাদ্দ এলে সকলেই কিছু না কিছু সহযোগীতা পাবে। তবে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে জেলেকার্ডে নাম অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়টি আমার জানা নেই।