বোরহানউদ্দিন দেউলা ইউনিয়নে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবী

প্রকাশিত: ১১:০০ অপরাহ্ণ, মার্চ ২২, ২০২১ | আপডেট: ১১:০০:অপরাহ্ণ, মার্চ ২২, ২০২১
বোরহানউদ্দিন দেউলা ইউনিয়নে স্মৃতিসৌধ নির্মাণের দাবী

সেই দিন ১৯৭১ সালের ১৬ অক্টোবর ছিল। পাক-বাহিনী খেয়া পেরিয়ে মানুষের ঘর-বাড়ীতে আগুন দিয়ে পুড়ে মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প আক্রমন করতে আসছে বোরহানউদ্দিন দেউলা ছাগলা গ্রামের মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্পে এ খবর পৌছান মুক্তিযোদ্ধা মো. জাহাঙ্গীর তালুকদার।

সবাই তখন ক্যাম্পে সকালের নাস্তা খাচ্ছি। এ খবর পেয়ে ক্যাম্প থেকে দৌঁড়িয়ে এসে আমরা মুক্তিযোদ্ধারা দেউলা তালুকদার বাড়ী সংলগ্ন সাদর আলী হাওলাদার বাড়ী’র পুকুরের পূর্ব পাড়ে অবস্থান নেই। পাক-বাহিনী ৩টা গ্রুপে ভাগ হয়ে দেউলা তালুকদার বাড়ী সংলগ্ন সাদর আলী বাড়ী’র কাছাকাছি আসেন। ওই দিন অনুমান সকাল ১০টা বাজে পাক-বাহিনী এ স্থান অতিক্রম করতে গেলে বীর মুক্তিযোদ্ধা ছিদ্দিকুর রহমানের নেতৃত্বে কৌশল করে পুকুরের ভিতর হতে পাক-বাহিনীর দিকে গুলি ছুড়তে থাকি। পাক-বাহিনী’র দুইটা গ্রুপকে অ্যাটাক করি আমরা। তারাও রাস্তার পূর্ব পাশে অবস্থান নিয়ে এলোপাতারি গুলি ছুড়তে থাকে।

আমরা ওদের দেখে গুলো করি কিন্তু ওরা আমাদের দেখতে পায় না। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে দীর্ঘ ৪ ঘন্টা যুদ্ধে রাজাকার সহ পাক-বাহিনী’র ৬০/৬৫ জন কে গুলি করে হত্যা করতে সক্ষম হই। এরপর গাজীপুর রোডে ৩ নাম্বার গ্রুপকেও অ্যাটাক করি। সেখানে পাক-বাহিনী ছত্রভঙ্গ হয়ে পালিয়ে যায়। সেখানেও একজন পাক-বাহিনীকে মেরে পেলি। একজন পাক-বাহিনী জীবন বাঁচাতে পালিয়ে গিয়ে পাশের পাঠান বাড়ী’র কারে গিয়ে পালায়। সন্ধ্যায় ঘরে কপি (চেরাগ) দিতে গিয়ে এক মহিলা দেখে বিশাল লাম্বা এক মানুষ। সে ডাক চিৎকার করলে ওই বাড়ী’র লোকজন মিলে ঝাড়ু দিয়ে পিঠিয়ে ওই পাক বাহিনী’র সৈন্যটিকে মেরে ফেলে। এ কথা গুলো বলছেন ভোলা বোরহানউদ্দিন উপজেলার সাবেক মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ও এ যুদ্ধে সরাসরি অংশ গ্রহণকারী বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. আছমত আলী মিয়া।

তিনি আরোও জানান, আমরা মাত্র ১৭ জন মুক্তিযোদ্ধা ছিলাম। বেশির ভাগই সেনাবাহিনীর সৈনিক ছিলাম। তাই সকলের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে পাক-বাহিনী’র সকলকে মেরে ফেলতে পেরেছি। এ যুদ্ধে কোন মুক্তিযোদ্ধা মারা যায়নি। ভোলা জেলার মধ্যে এটি সব চেয়ে বড় যুদ্ধ হয়েছিল এবং মুক্তিযোদ্ধারা সব চেয়ে বেশি পাক-বাহিনীকে মারতে সক্ষম হয়েছি। কিন্তু অনেক কষ্ট লাগে স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলোও আজ এ যুদ্ধের স্থানটিকে সরকারি ভাগে সংরক্ষণ করা হয়নি।

তিনি আরোও বলেন, এ স্থানটিতে একটি স্মৃতিসৌধ হলে এলাকার নতুন প্রজন্ম জানতে পারবে যে তাদের পূর্ব পুরুষ এখানে যুদ্ধ করেছে। ৫০/৬০ জন পাক-বাহিনীকে কিভাবে মেরে ফেলেছে। তাই স্থানীয় সংসদ সদস্য আলী আজম মুকুল মহোদয়ের কাছে দ্রুত এখানে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মানের দাবী করছি।

ওই এলাকার সাদর আলী হাওলাদার বাড়ী’র মো. ইউসুফ (৭০) ও আবুল বাশার (৬৫) জানান, আমাদের পুকুর পাড় হতেই মুক্তিযোদ্ধারা এ যুদ্ধ করেন। আজও পাক-বাহিনীর ছোরাগুলি’র আঘাতের চিহৃ রয়েছে। ওই সময় আমরা এ যুদ্ধ দেখেছি। এখানে একটি স্মৃতিসৌধ করার জন্য জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা করছি।

ওই এলাকার মো. মনিরুল ইসলাম বলেন, আমরা ছোটবেলা হতে শুনে আসছি এখানে যুদ্ধে পাক-বাহিনী’র ৬০-৬৫ জন হতাহত হয়েছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫০ বছর পেরিয়ে গেলেও অদ্যবধি এ স্থানটিতে একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করা হয়নি। তিনি আরোও বলেন, নতুন প্রজন্মকে সঠিক ইতিহাস সম্পর্কে জানাতে এখানে একটি স্মৃতিসৌধও নির্মান করা খুবই জরুরী।

বোরহানউদ্দিন উপজেলা নির্বাহি অফিসার ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার (ভারপ্রাপ্ত) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, ভোলা জেলার মধ্যে মুক্তিযোদ্ধাদের বড় একটি বিজয় হয়েছে এ স্থানটিতে। মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে ওই স্থানটিতে স্থানীয় এমপি’র স্যারের সহযোগিতায় খুব দ্রুত একটি স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করার উদ্যোগ গ্রহন করবো।

স্থানীয় সাংসদ আলী আজম মুকুল বলেন, এ স্থানটিতে ভোলা জেলার মধ্যে পাকহানাদার বাহিনী’র সাথে মুক্তিযোদ্ধাদের সবচেয়ে বড় যুদ্ধ হয় এবং এ যুদ্ধে রাজাকার সহ পাক-বাহিনী’র অনেক সৈন্য কে হতাহত করেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। ওখানকার জমি’র মালিকরা জমি দিলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানে একটি স্মৃতিসৌধ দ্রুত নির্মাণ করা হবে। যাতে করে মুক্তিযোদ্ধাকালীন সময়ের সঠিক ইতিহাস আমাদের নতুন প্রজন্ম জানতে পারেন।